Saturday, April 25, 2020

পৌণ্ড্র জাতি সংক্রান্ত

১। পৌন্ড্র জনগোষ্ঠীর জাতিসত্ত্বার ইতিবৃত্ত ও কিছু কথা
****************

"যেখানে দেখিবে ছাই, কুড়াইয়া দেখ তাই
পাইলে পাইতে পার অমূল্য রতন"---

আমরা 'বাঙালি- হিন্দু' বলে গর্বিত বোধ করি, কিন্তু জাতিতে 'পৌন্ড্র' বলে নিজের পরিচয় দিতে সঙ্কোচ বা অস্বস্তি বোধ হয়। খুবই স্বাভাবিক। জাতিসত্ত্বার ইতিহাস- অজ্ঞতা থাকলে যা হয় আর কি! তথাকথিত নিচু জাতের তকমাপ্রাপ্ত কোনো জাতি, গোষ্ঠী অথবা সম্প্রদায়- তাদের জাতিসত্ত্বার অতীত ইতিহাস সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে না পারলেই তো নানাধরণের কুসংস্কার,সঙ্কোচ,ভয়,লজ্জার মতো  মানসিক রোগের শিকার বনে যায়।  এককথায় মনে হীনমন্যতা জেঁকে বসে। এই হীনমন্যতা নিরসনের একমাত্র উপায় কোনো জনগোষ্ঠীর অতীত জাতিসত্ত্বার ইতিহাস চর্চা করা। ড: আম্বেদকর বলেছিলেন," ইতিহাস-অজ্ঞ জাতি কখনো আগামীদিনের ইতিহাস সৃষ্টি করতে পারে না"।  তো আসুন, পৌন্ড্র হিসেবে সংক্ষেপে আমাদের অতীত ইতিহাস চর্চা করি।

পৌন্ড্ররা কারা? উঁচু-নীচু স্তরভিত্তিক ভারতীয় সমাজে কোথায় তাদের অবস্থান? তাদের জাতিসত্ত্বার ইতিহাস‌ই বা কি? সেই ইতিহাস কি সত্যিই অগৌরবের? এই সমস্ত প্রশ্নগুলো বর্তমান জাতিবর্ণ-বৈরীতার আবহে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে। কারণ, আমাদের মধ্যে আত্মমর্যাদাবোধের অভাব রয়েছে; আমরা আত্মনির্ভরশীল ন‌ই এবং এই দূর্বলতাগুলো আমাদের গোষ্ঠীভিত্তিক আত্মোন্নয়নকে ব্যাহত করছে। ফলে, আমরা রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিক আধিপত্যবাদের শিকার হয়ে চলেছি।

 প্রথম প্রশ্নের জবাব হোল,পৌন্ড্ররা ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী তফসিলি জাতিভুক্ত( সামাজিক ও শৈক্ষিকভাবে পশ্চাদপদ) এবং মনুমহারাজের সংবিধান (মনুস্মৃতি) অনুযায়ী এ জাতি অবর্ণ/অস্পৃশ্য। অর্থাৎ আমাদের ছোঁয়া লাগলে উচ্চকোটির (তথাকথিত উচ্চবর্ণ) মানুষজন অপবিত্র হয়ে যায়।

 দ্বিতীয় প্রশ্নের উত্তর হলো,পৌন্ড্রজাতি ভারতীয় সমাজের এক পতিত প্রান্তবাসী। উচ্চবর্ণের গলগ্রহ।

 তৃতীয় প্রশ্নের উত্তর হলো,পৌন্ড্রজাতি একটি ইতিহাস বিস্মৃত জাতি। তাই, পরস্পর বিচ্ছিন্ন, আত্মমর্যাদাহীন এবং আত্মোন্নয়নবিমুখ।

চতুর্থ প্রশ্নের উত্তরটি খুব গুরুত্বপূর্ণ। গর্বের সঙ্গে বলতে চাই, পৌন্ড্রদের জাতিসত্ত্বার ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবের। প্রাচীন বাংলার পৌন্ড্র জনগোষ্ঠী একটি গৌরবোজ্জ্বল সভ্যতার জন্মদাতা -- তার ভুরি ভুরি প্রমাণ পাওয়া যায় বৈদেশিক ইতিহাসকারদের রচনায়।

পৌন্ড্রজাতির অতীত ইতিহাস অন্বেষণে আমাদের দেশীয় ও বৈদেশিক-এই দুই-ধরণের ইতিহাস চর্চা করতে হবে। তবে, ইতিহাস চর্চা করতে গিয়ে দেখা যাচ্ছে- ভারতের প্রাচীন ইতিহাস বলতে তেমন পাতে দেওয়ার মতো কিছু নেই। ইতিহাস বলে চালিত কতকগুলো শাস্ত্রগ্রন্থ যেমন রামায়ন, মহাভারত, অষ্টাদশ পূরাণসমূহে যে সব কল্পকথার জাল বোনা হয়েছে, তাকে আর যাইহোক ইতিহাস বলা চলেনা। তবে,রামায়ন, মহাভারত এবং কয়েকটি পূরাণে প্রাচীন ইতিহাসের কিছু কিছু উপাদান রয়েছে। কয়েকটি শ্রুতি ও স্মৃতি গ্রন্থে পৌন্ড্রজাতির অতীত ইতিহাস লুকিয়ে রয়েছে। সেখানে পৌন্ড্রজাতি জাতিবাচক ও দেশবাচকরূপে বর্ণিত হয়েছে-যেমন 'পুন্ড্র' দেশবাচক (পুন্ড্রজাতির রাজ্য) এবং 'পুন্ড্রবর্ধন' ও 'পৌন্ড্রবর্ধন' -নগরবাচক।

ঐতরেয় ব্রাহ্মণ,রামায়ন-কিষ্কিন্ধাকান্ড,মহাভারত-আদিপর্ব,সভাপর্ব,ভীষ্মপর্ব,দ্রোণপর্ব, কর্ণপর্ব, অনুশাসনপর্ব, হরিবংশ, মনুসংহিতা,ব্রহ্মবৈবর্ত পূরাণাদি, কৌটিল্যের অর্থশাস্ত্র, ভরতের নাট্যশাস্ত্র, পতঞ্জলির মহাভাষ্য, কলহনের রাজতরঙ্গিণী জৈনকল্পসূত্র, হর্ষচরিত,রামচরিত, কথাসরিৎসাগর প্রভৃতি পূরাণভিত্তিক ইতিহাসে পুন্ড্রদেশ ও পৌন্ড্রজাতির উল্লেখ পাওয়া যায়।  তবে এই সমস্ত ব্রাহ্মণ্য শাস্ত্রগ্রন্থগুলো পৌন্ড্রদেশ ও পৌন্ড্রজাতির শৌর্য-বীর্যের গুণকীর্তণের পরিবর্তে ম্লেচ্ছদেশ/পাতালপুরী এবং ম্লেচ্ছজাতি/দস্যু রূপে কলঙ্কিত করেছে। আসলে এই কলঙ্ক লেপনের পেছনে রয়েছে ইতিহাস বিকৃতি। উদ্দেশ্যমূলকভাবে বিশেষ এক জাতিগোষ্ঠীর সাংস্কৃতিক প্রাধান্য প্রতিষ্ঠার প্রবনতা চলে এসেছে বৈদিককাল থেকে। এর পরিনামে ,বেদে পুন্ড্র জনগোষ্ঠীকে 'দস্যুজীবী' বলা হয়েছে।

মহাভারতের বিবরণে পৌন্ড্ররা সামন্ততান্ত্রিক 'ক্ষত্রিয়' জাতি হিসেবে বর্ণিত হাতে দেখা যায়। মহাভারতে পৌন্ড্র 'সম্রাট বাসুদেবের' উল্লেখ পাওয়া যায় এবং আধুনিক ইতিহাস গবেষকদের মতে তিনি একজন ঐতিহাসিক চরিত্র। তাঁর বৈমাত্রেয় ভাই মহামুনি কপিল ছিলেন পৃথিবীর প্রাচীনতম জড়তত্ত্ব বিশিষ্ট 'সাংখ্যদর্শনের' স্রষ্টা। সম্রাট বাসুদেব নিজ বাহুবলে বঙ্গ ও কিরাতদেশ জয় করেছিলেন এবং বারানসী পর্যন্ত ছিল তাঁর রাজ্যের বিস্তৃতি। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে তিনি একলব্য, প্রাগজ্যোতিষপুরের রাজা নরক এবং মগধরাজ জরাসন্ধ্রের মতো অনার্য রাজাদের সঙ্গে জোট বেঁধে কৌরবপক্ষে যুদ্ধ করেছিলেন। হরিবংশের বর্ণনানুসারে বাসুদেব কৃষ্ণের রাজধানী দ্বারকা আক্রমণ করেছিলেন। হরিবংশের আর একটি কিংবদন্তি অনুসারে জানা যাচ্ছে যে, চন্দ্রবংশীয় নৃপতি বলির অন্যতম পুত্র 'পুন্ড্র' নাকি প্রাচীন এই অঞ্চলের শাসক ছিলেন। তাঁর নামেই নাকি এই অঞ্চলের নাম পুন্ড্রদেশ বলে প্রসিদ্ধ ছিল। বাল্মিকী রামায়নেও পুন্ড্রদেশ নামের উল্লেখ পাওয়া যায়।  ঐতরেয় ব্রাহ্মণে পুন্ড্রদেশ ও জাতি সম্বন্ধে উল্লেখ করা হয়েছে।

স্কন্দপুরাণের করতোয়া মাহাত্ম্যে পুন্ড্রনগর করতোয়া নদীর তীরে অবস্থিত বলে বর্ণিত। মার্কন্ডেয় পুরাণ এবং মৎসপুরাণে পুন্ড্রদেশকে ভারতের পূর্বাঞ্চলীয় একটি জনপদ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। রাজতরঙ্গিনীতে উল্লেখ করা হয়েছে যে,কাশ্মীরি রাজকুমার ছদ্মবেশে কিছুদিন পুন্ড্রনগরে বসবাস করেছেন।  জৈন শাস্ত্রগুলিতে পুন্ড্ররাজ্যকে 'পুন্ড্রবর্ধন' দেশ বলে অভিহিত করা হয়েছে। খ্রীষ্টপূর্ব দ্বিতীয় অব্দে চৈনিক পরিব্রাজকদের মধ্যে পুন্ড্রদেশ সম্পর্কে সর্বপ্রথম উল্লেখ করেছেন চাঙ-কিয়েন। সপ্তম শতাব্দীতে চৈনিক পরিব্রাজক হিউয়েন সাঙ পুন্ড্রদেশে এসেছিলেন। তিনি পুন্ড্রদেশের সীমা ৮০০ মাইল বলে তাঁর বিবরণীতে উল্লেখ করেছেন।

যে জাতির সংস্কৃতি যতটা উন্নত, সে জাতি ততটাই সভ্য এবং সেই জাতি দ্বারা সৃষ্ট সভ্যতাও অনুরূপভাবে উন্নত মানের হয়ে থাকে । আমরা জানি যে, সিন্ধু সভ্যতা ভারতবর্ষের প্রাচীনতম সভ্যতা। পাশাপাশি,নিম্নগাঙ্গেয় অঞ্চলে একটি সভ্যতার উন্মেষ ঘটেছিল,যে সভ্যতার নাম গঙ্গারিডি/গঙ্গারিদাই সভ্যতা। আক্ষেপের কথা যে, ভারতের প্রাচীন ইতিহাসের পাতায় এই দুর্ধর্ষ সভ্যতা আলোকিত হয়নি। তাকে খুঁজতে হয়েছে বিদেশী ইতিহাসবিদদের রচনার মধ্যে। এদেশীয় পূরাণ-সমূহে পৌন্ড্রজাতিকে নিম্নকোটির হীনজাতি হিসেবে দেখানো হলেও বিদেশী ইতিহাসবিদদের রচনায় পৌন্ড্রগোষ্ঠী পৃথিবীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ ও বীর্যবান জাতি -রূপে আলোকিত হয়েছে।

৩২৬-খ্রীস্টপূর্বাব্দে গ্রীক-অধিপতি আলেকজান্ডার ভারত আক্রমণকালে দুটি পরাক্রমশালী রাষ্ট্রের কথা জানতে পারেন। প্রাসী (প্রাচ্য) ও গঙ্গারিডি নামে দুই পরাক্রমশালী রাষ্ট্র বিশাল রণসম্ভার নিয়ে আলেকজান্ডারের আক্রমন প্রতিহত করবার জন্য অপেক্ষা করছে। অগত্যা,এই দুই রাষ্ট্রের শৌর্যবীর্যের কথা শুনে স্বদেশে প্রত্যাবর্তনকালে  ক্লান্ত ও অবসন্ন আলেকজান্ডার ব্যাবিলনের পথে মৃত্যুবরণ করেন। পরবর্তীকালের গ্রীক ও রোমান ইতিহাস লেখকদের রচনায় গঙ্গারিডি রাষ্ট্রের অধিবাসীদের শৌর্যবীর্যের অনেক কথা জানা যায়। তাঁদের বর্ণনায় জানা গিয়েছে যে, গঙ্গারিডি রাষ্ট্র গঙ্গানদীর মোহনা অঞ্চলে অবস্থিত ছিল এবং এই রাষ্ট্রের প্রধান বন্দরের নাম ছিল 'গঙ্গে'।

ভারতীয় ইতিহাসে গঙ্গারিডি রাষ্ট্রের কথা অনুল্লেখিত থাকলেও এই রাষ্ট্র সম্বন্ধে প্রথম দৃষ্টি আকর্ষণ করেন সাহিত্যসম্রাট বঙ্কিমচন্দ্র তাঁর সুপ্রসিদ্ধ 'বাংলার কলঙ্ক' প্রবন্ধে। আরও পরে গঙ্গারিডি সম্বন্ধে বিশদভাবে আলোচনা করেন হেমচন্দ্র রায় তাঁর 'আলেকজান্ডার কেন বিপাশা নদী অতিক্রম করেন নি?' শীর্ষক ইংরেজি প্রবন্ধে। ড: অতুল সূর তাঁর 'বাঙালা ও বাঙালির বিবর্তন' গ্রন্থে গঙ্গারিডির রাষ্ট্রের অস্তিত্বের প্রমাণ তুলে ধরেছেন। পরিশেষে পৌন্ড্রপ্রবর নরোত্তম হালদার মহাশয় তাঁর 'গঙ্গারিডি' গবেষণায় প্রমাণ করেন 'গঙ্গারিডি' রাষ্ট্রের অস্তিত্বের।

গঙ্গারিডি রাষ্ট্র সম্বন্ধে যে সব তথ্য গ্রীক ও রোমান ইতিহাস লেখকদের রচনায় উঠে এসেছে, সেই লেখকদের কথা অল্পবিস্তর উল্লেখ করা হলো:--

 মেগাস্থিনিস: চন্দ্রগুপ্ত মৌর্যের রাজত্বকালে গ্রীক রাষ্ট্রদূত হয়ে আসেন এবং তিনি তৎকালীন ভারতবর্ষের বিষয়ভিত্তিক বর্ণনা-সমৃদ্ধ একটি গ্রন্থ রচনা করেন। 'ইন্ডিকা' নামক সেই গ্রন্থেই আমরা প্রথম গঙ্গারিডি রাষ্ট্রের উল্লেখ পাই।

পুবলিয়াস্ ভার্জিলিয়াস মারো: তিনি রোমান ইতিহাসবিদ ও কবি। তাঁর 'জর্জিকাস্' কাব্যে গঙ্গারিডিদের শৌর্যবীর্য সম্বন্ধে প্রশস্তিমূলক উক্তি আছে।

ডিওদোরাস সিকুলাস: তিনি খ্রীষ্টপূর্ব প্রথম শতাব্দীতে 'বিবলিওথিকা হিস্টরিকা' নামের ইতিহাসে গঙ্গারিডি রাষ্ট্রের উল্লেখ করেছেন।

গেইয়াস প্লিনিয়াস সেকান্ডাস: প্লিনি নামে সুপ্রসিদ্ধ এই রোমান ইতিহাসবিদ তাঁর 'হিস্টিরিয়া ন্যাচারালো'  নামে এক বিশ্বকোষে গঙ্গারিডি রাষ্ট্রের কথা উল্লেখ করে গিয়েছেন।

পেরিপ্লাস অব দি ইরিথ্রিয়ান সী: এক অজ্ঞাতনামা মিশরীয় নাবিক খ্রীষ্টীয় প্রথম শতাব্দীতে এই গ্রন্থে গঙ্গারিডির কথা বলে গিয়েছেন। তিনি 'গাঙ্গে' নামক নগর-বন্দরের কথাও উল্লেখ করেন।

ভেলেরিয়াস ফ্লাক্কাস্: এক‌ই শতাব্দীতে রোমদেশীয় এই কবি 'আরগণটিকা' নামে একটি কাব্যগ্রন্থে গঙ্গারিডি দেশের বীরদের প্রশংশা করেছেন।

টলেমি: বিখ্যাত জ্যোতির্বিদ ও গণিতজ্ঞ টলেমি তাঁর ভূগোল বিষয়ক এক বিখ্যাত গ্রন্থে 'গাঙ্গে' নামক বন্দর-নগরের কথা উল্লেখ করেছেন।

গেইয়াস জুলিয়াস সলিনাস্: খ্রীষ্টীয় তৃতীয় শতকের ব্যাকরণবিদ ও লেখক তাঁর 'পলিহিস্টর' নামে এক গ্রন্থে গঙ্গারিডির কথা বলে গিয়েছেন।

পূর্বোক্ত তথ্য-প্রমানদির ভিত্তিতে আমরা এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে,গঙ্গানদীর মোহনা অঞ্চলে নিম্নবঙ্গের একটি সম্মিলিত জাতিগোষ্ঠীর নাম‌ই হলো 'গঙ্গারিডি' বা 'গঙ্গারিদাই'। লক্ষনীয় যে,বিদেশী লেখকগণ যে সময়কালে গঙ্গারিডি সভ্যতা,রাষ্ট্র ও জাতির কথা উল্লেখ করে গিয়েছেন, সেই সময়কাল ছিল মূলতঃ খ্রীষ্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দীর অন্তিমপর্ব থেকে খ্রীষ্টীয় তৃতীয় শতক পর্যন্ত। এই সময়কালে লেখা হয়েছিল রামায়ন-মহাভারতাদি গ্রন্থগুলি। অথচ এই গ্রন্থগুলির কোথাও গঙ্গারিডি অথবা গঙ্গে নামে কোন নগর-বন্দরের নাম নেই। তবে, পুন্ড্ররাজ্যের অধিবাসীদের কথা উল্লেখিত আছে। মহাভারতেই তো নিম্নগাঙ্গেয় অঞ্চলকে ম্লেচ্ছজাতীয় দেশ বা পাতালপুরী বলে উল্লেখ করা হয়েছে। তৎকালীন আর্য-ব্রাহ্মণদের কাছে এই জাতিগোষ্ঠী ছিল অবজ্ঞার পাত্র। জৈন আমলে এই গঙ্গারিডি জাতি 'পুন্ড্রবর্ধনীয়' নামে পরিচিত ছিল। অতি প্রাচীনকালে উত্তরবঙ্গে যে 'পুন্ড্র' রাজ্যের ভিত্তি স্থাপিত হয়েছিল,তা পরবর্তীতে 'পুন্ড্রবর্ধন ভুক্তি' হিসাবে দক্ষিণবঙ্গের সমুদ্রকূল পর্যন্ত বিস্তৃত হয়েছিল। এই পুন্ড্রবর্ধন রাজ্যের অধিবাসীরা ছিলেন  বৌদ্ধ ও জৈন ধর্মাবলম্বী। এরাই সেকালে গঙ্গারিডি জাতি বলে পরিচিত ছিল। বিগত কয়েক বছর ধরে দক্ষিণবঙ্গের বিভিন্ন এলাকায় প্রত্নতাত্ত্বিক খননের ফলে যে সমস্ত প্রত্নবস্তু পাওয়া গিয়েছে,তাঁর থেকে এই বক্তব্যের যথেষ্ট প্রমাণ পাওয়া যায়। এছাড়াও আবিস্কৃত হয়েছে নলরাজার গড়,পান্ডুরাজার ঢিপি। পালযুগ পর্যন্ত পৌন্ড্রবর্ধনীয়রা সেই জৈন ও বৌদ্ধ সংস্কৃতি দীর্ঘায়িত করেছিলেন। বৃহদ্বঙ্গে পৌন্ড্রক্ষত্রিয়, রাজবংশী, ব্যগ্রক্ষত্রিয়, নমঃশূদ্র, কৈবর্ত, ডোম প্রভৃতি বহুসংখ্যক যোদ্ধৃ জনগোষ্ঠী দক্ষিন পুন্ড্রবর্ধনের অধিবাসী হিসেবে এদেশে পুন্ড্রবর্ধনীয় বা পৌন্ড্রজাতি (Nation) রূপে পরিগণিত হয়েছিল। তাদের মধ্যে জেগেছিল জাতিত্ববোধ (Sense of Nationhood), আর ভাগীরথী-আদিগঙ্গার মোহনা অঞ্চলে  প্রথম উপনিবেশ স্থাপনকারী পৌন্ড্র জনগোষ্ঠীর মানুষেরা সেখানে যে রাজ্য বা জনপদ গড়ে তুলেছিল,গ্রীক, রোমান এবং চৈনিক লেখকবৃন্দ তাকেই 'গঙ্গা' জনপদ রূপে অভিহিত করেছেন।

তাহলে, পৌন্ড্র জনগোষ্ঠীর  সামগ্রিক গৌরবগাথা পর্যালোচনার প্রেক্ষিতে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতে পারি যে, জল-জঙ্গলজীবী আমরা সেই পৌন্ড্র-জনগোষ্ঠীভুক্ত মানুষ, যারা সুদূর অতীতের গঙ্গারিডি জাতির বর্তমান উত্তরসূরি। আজ ব্রাহ্মণ্য-বর্ণবাদের দুর্বিপাকে পাক খেতে খেতে এই আমরা--অস্পৃশ্য তকমাপ্রাপ্ত,অসংগঠিত, আত্মমর্যাদাহীন, হীনবল ও অলস এক পতিত জনজাতি হিসাবে অধঃপতিত হয়েছি। অথচ,কী গৌরবান্বিত ছিল আমাদের অতীত সভ্যতা! শৌর্যবীর্য, বৈদেশিক বাণিজ্য,ঐশ্বর্য, শিক্ষা, সংস্কৃতি, দার্শনিক ভাবনা,ও বিজ্ঞানচর্চার প্রতিটি শাখায় আমাদের পূর্বসূরীদের ছিল অবাধ বিচরণ। যে দুর্ধর্ষ যোদ্ধৃ জাতির বীরত্বের পরিচয় পেয়ে আলেকজান্ডারের মতো দিগ্বিজয়ী গ্রীক সম্রাট স্বদেশে প্রত্যাবর্তনে বাধ্য হয়েছিলেন, গ্রীক ও রোমান লেখককূল যে জাতির শৌর্যবীর্যকে উচ্চনাদে কীর্তিত করে গিয়েছেন-সেই জাতির এমন গৌরবের ইতিহাস উন্মোচনের পর, আমাদের আত্মশ্লাঘা ও  আত্মমর্যাদা পুনর্নির্মাণের অনুপ্রেরণা এবং আকাংখা কেন জাগবেনা? বহুকাল আগে থেকে ভারতবর্ষের মনুবাদী জাতিবর্ণ ভিত্তিক সামাজিক পরিসরে আমরা অস্পৃশ্যতাজনিত হীনমন্যতায় ভুগে চলেছি।  কিন্তু কেন? কোনো মানুষই তো  অস্পৃশ্য হয়ে জন্মায়না। সমতাভিত্তিক একটি গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে আত্মসম্মান নিয়ে জীবনযাপনের অধিকার প্রত্যেকটি মানুষের,প্রত্যেকটি জাতির রয়েছে। আমাদের জাতিসত্ত্বা-সমৃদ্ধ অতীত ইতিহাস জানার পরেও  আমরা যদি মনুবাদী সংস্কার আর সঙ্কোচ-লজ্জা বাঁচিয়ে রেখে আত্মপরিচয় গোপন করি, তবে কোনো কালেই আমাদের পতিত দূরবস্থার হাত থেকে কোনভাবেই রেহাই মিলবেনা-এই সত্যি কথাটা জোর দিয়ে বলতে পারি। সুতরাং,আমার পৌন্ড্র-স্বজনদের কাছে একটাই অনুরোধ, মনুবাদের বেড়াজাল কেটে মাথা উঁচু করে দাঁড়াতে চেষ্টা করুন। বুদ্ধ-আম্বেদকর ভাবনাকে চালিকাশক্তি হিসেবে গ্রহণ করুন। আমাদের মনে রাখতে হবে বাবাসাহেবের সেই জীবনীশক্তি উদ্রেককারী নির্দেশের কথা--" শিক্ষিত হ‌ও,সংগ্রাম কর, সংগঠিত হ‌ও"। অধিকার ভিক্ষায় মেলেনা। তা অর্জন করতে হলে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর হয়ে উঠতে  হবে। ভারতীয় সংবিধানের প্রতিটি ধারা সম্পর্কে অবগত হতে থাকুন। মনে রাখা দরকার-কোনো আন্দোলনের প্রানশক্তি হলো সাংগঠনিক দায়বদ্ধতা। সেই দায়িত্ব পালনের মানসিক শক্তি জোগায় সাংগঠনিক ঐক্য। তাই পৌন্ড্র মণীষীর কথায় বলি-" একতাই বল; সংঘশক্তি মহাশক্তি"।

সুদর্শন মণি

তথ্যসূত্রঃ-
বাঙলা ও বাঙালির বিবর্তন'-অতুল সুর
গঙ্গারিডি আলোচনা ও পর্যালোচনা-নরোত্তম হালদার,
পুন্ড্রদেশ ও জাতির ইতিহাস-শ্যামল কুমার প্রামাণিক।
..................................................................................................................................

[6:35 pm, 25/04/2020, WhatsApp grou post] Sudarsan Mani: প্রয়োজন মনে করে কয়েকটা কথা উল্লেখ করছি আমরা সবাই জানি যে, আমাদের এই দেশটা বহুমাত্রিক সংস্কৃতির দেশ এবং এই দেশের জাতিবর্ণবাদ উদ্ভূত জটিলতা অন্য কোনো দেশেই নেই জাতিবর্ণ আছে বলেই আমাদের সমাজ উঁচু-নিচু থাকবিশিষ্ট ব্রাহ্মণ, ক্ষত্রিয় আর বৈশ্য ছাড়াও শূদ্র, অতিশূদ্র তথা অস্পৃশ্য জাতিভুক্ত মানুষদের নিয়ে ভারতীয় সমাজ শূদ্র,অতিশূদ্র অস্পৃশ্য জাতিকে (OBC/SC/ST) আবার ৬৭৪৭ উপজাতে (Sub Caste) বিভক্ত করা হয়েছে এই উপজাতগুলো আবার উঁচু-নীচু স্তরবিশিষ্ট (Graded Inequality) পৌন্ড্রগোষ্ঠী এমন একটা উপজাত
  বিষয়টা মনে রাখা দরকার যে, প্রত্যেকটি উপজাতের জাতিসত্ত্বার ইতিহাস রয়েছে সে ইতিহাস গৌরবের ইতিহাস আমরা পৌন্ড্রগোষ্ঠীভুক্ত আমাদের মধ্যে অনেকেই জানিনা যে, আমাদের জাতিসত্ত্বার ইতিহাস অত্যন্ত গৌরবের সেই ইতিহাস জানা খুব জরুরী সেই সঙ্গে আমাদের মনীষীদের জীবনী আমাদের সার্বিক উন্নয়নে তাঁদের অবদান সম্পর্কেও ধারণা থাকা দরকার তাহলেই আমরা পারস্পরিক স্বজনবোধে উদ্বুদ্ধ হতে পারি এবং আমাদের গোটা পৌন্ড্রগোষ্ঠী একটা পরিবারের মতই অন্তরঙ্গ হয়ে উঠতে পারে
অনেকেই প্রশ্ন তুলবেন-শুধু পৌন্ড্র কেন? তাহলে আমার প্রশ্ন-বাবাসাহেব কি তাঁর গোষ্ঠীকে ঐক্যবদ্ধ করেননি? তিনি যে গোষ্ঠীতে জন্মেছিলেন, সেই মাহারগোষ্ঠী ঐক্যবদ্ধ ছিল বলেই তিনি সামাজিক আন্দোলনের সূচনা করতে পেরেছিলেন; আর তাঁর আত্মত্যাগের ফসল আমরা ঘরে তুলেছি এবং তুলছি সুতরাং, আমাদের গোষ্ঠীভিত্তিক ইতিহাস আমাদের জানতেই হবে  ধন্যবাদ
 জয় পৌন্ড্র ঐক্য!
জয় পৌন্ড্র মহাসংঘ!
............................................................................................................................
2. নিদ্রামগ্ন পৌন্ড্র-জনগোষ্ঠী
*********
আত্মচেতনা গোষ্ঠীচেতনার উৎস। সমাজবদ্ধতা গোষ্ঠীচেতনার অবশ্যম্ভাবী পরিণাম। কালের বিবর্তনে যে জনসমাজের গোষ্ঠীচেতনা হারিয়ে যায়, সাথে সাথেই হারিয়ে যায় তাদের গৌরবোজ্জল অতীত ইতিহাস। আত্মবিস্মৃত ও ইতিহাসবিমুখ জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব সংকটাপন্ন অবস্থায় পৌঁছায়। ভারতের মূলনিবাসী, দুর্ধর্ষ গঙ্গারিডি সভ্যতার ধারক ও বাহক পৌন্ড্র-জনগোষ্ঠীর অস্তিত্ব আজ সংকটাপন্ন।

জীবদেহের স্নায়বিক শৈথিল্য নিদ্রা সৃষ্টি করে-জীববিদ্যা আমাদের এই শিক্ষা দেয়। পৌন্ড্র-জনগোষ্ঠী আজ স্নায়বিক শৈথিল্যে আক্রান্ত-গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন। রামায়নে বর্ণিত লঙ্কাকাধিপতি রাবনের সহোদর 'কুম্ভকর্ণের নাম আমরা সবাই জানি। কথিত আছে যে 'কুম্ভকর্ণ' ছয়মাস ধরে একটানা ঘুমিয়ে, একদিন জাগ্রত থেকেই আবার ছয়মাস ঘুমিয়ে পড়তেন।  বিনিদ্র দিনটি তাঁর আহার, বিহার,বিলাস-ব্যসনে অতিবাহিত হোত। বহির্জগতের নানাবিধ ঘটনাবলী ও ভাবের সাথে তাঁর কোনো সম্পর্ক থাকত না।

পশ্চিমবঙ্গের অন্যতম বৃহৎ জনগোষ্ঠী পৌন্ড্রদের অবস্থা ঠিক 'কুম্ভকর্ণের গভীর নিদ্রাচ্ছন্নতার ' সাথে তূলনীয়। যদিও কুম্ভকর্ণ একদিন জাগ্রত থাকতেন, পৌন্ড্রগোষ্ঠীর অধিকাংশ স্বজন বারোমাস‌ই গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন থাকেন। কেউ কেউ কপট নিদ্রায় আচ্ছন্ন থাকতে পছন্দ করেন।

গভীর নিদ্রা-উদ্রেককারী উপাদানগুলির অন্যতম মাদকদ্রব্য। মাদক সেবনে স্নায়বিক উত্তেজনার পরিণামে স্নায়বিক শৈথিল্য সৃষ্টি হয় এবং মাদকাসক্ত ব্যক্তি গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে-যা মৃত্যুর সমগোত্রীয়।

বহুকাল থেকেই পৌন্ড্র-জনগোষ্ঠী ব্রাহ্মণ্যবাদ নামক মাদক-সেবনে আচ্ছন্ন-গভীর নিদ্রায় নিমগ্ন। তাঁদের গৌরবান্বিত জাতিসত্ত্বা ভূলুণ্ঠিত, মনুসংহিতার বিধান তাঁদের অপৃশ্যতা-শৃঙ্খলে আবদ্ধ করে এক পরাধীন জনগোষ্ঠীতে পরিণত করেছে।  ব্রাহ্মণ্য সংস্কৃতির দীর্ঘকালীন প্রভাবে তাঁদের উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন স্বতন্ত্র বিচারবোধ কবেই হারিয়ে গিয়েছে। অশিক্ষা আর কুসংস্কারের নিগড়ে বাঁধা এই জনগোষ্ঠীর জীবন-দর্শনের নানাবিধ শাখা-প্রশাখায় আর বিচরণ ঘটেনা। অচেতন জড়ের  মতো বৃহত্তর সমাজের তলানিতে তাঁদের-"ন যযৌ,ন তস্থৌ" অবস্থা!

পৌন্ড্র-জনগোষ্ঠী আজ ব্রাহ্মণ্যবাদীদের হাতের পুতুল। ব্রাহ্মণ্যবাদী প্রভুদের আজ্ঞাবহ এই জনগোষ্ঠী ভিন্নমাত্রার রাজনৈতিক ষড়যন্ত্রের শিকার, অর্থনৈতিক শোষণের শিকার, ধর্মীয় কুসংস্কারের শিকার। ধর্মীয় উন্মাদনায় এক নিমেষেই জীবনাহুতি দিতেও প্রস্তুত। তাই তো এই জনগোষ্ঠী পিতৃঘাতী, ভ্রাতৃঘাতী,বান্ধবঘাতী ভুমিকা পালনেও সনিষ্ঠ। কারণ, সমাজের সর্বনিম্নস্তরের অন্ধকারময় দমবন্ধ পরিবেশে সংকীর্ণ জীবনযাপনে অভ্যস্ত হতে হতে- সংকীর্ণ ও একধরনের বিকলাঙ্গ মানসিক বিকারের কবলে নিপাতিত হয়েছে। মেধা,যোগ্যতার বিকাশ ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা বাস্তবায়নের সহায়তায় প্রভাব-প্রতিপত্তি প্রতিষ্ঠার বাসনা আজ  এই জনগোষ্ঠীর কাছে আকাশ-কুসুম কল্পনা মাত্র। এই অবকাশে ব্রাহ্মণ্যবাদের ধ্বজাধারীরা এনাদের বিশ্বস্ত সৈনিক বানানোর সুযোগ পায়। জীবনধারণের জন্য নূন্যতম চাহিদাটুকু পুরণ না হলেও প্রভু-আজ্ঞা অক্ষরে অক্ষরে পালনে সদাই প্রস্তুত। যেকোনো অমানবিক ও নিষ্ঠুর কর্মেও সিদ্ধহস্ত হয়ে উঠেছে। অবশিষ্ট সময় আলস্যে ভরা পরনির্ভরশীলতা, অকারণে ভিত্তিহীন তর্কযুদ্ধ, বিভিন্নমুখী অসামাজিক আচরণ ও কার্যকলাপ-এই জনগোষ্ঠীর জীবনধারার অবিচ্ছিন্ন অংশ হয়ে দাঁড়িয়েছে। এই গোষ্ঠীর পরিকল্পনা বহির্ভূত ও বেহিসাবি চালচলনের খেসারত দিতে হচ্ছে তাঁদের পরিবার-পরিজনদের।

সমকালীন পৌন্ড্র পরিবারভুক্ত মহিলাদের সামাজিক অবস্থান অত্যন্ত অসম্মানের এবং লজ্জাজনক।  অতীতের যৌথ পরিবারগুলির অধিকাংশে মহিলাদের প্রভাব-প্রতিপত্তি ও মান-মর্যাদা অক্ষুন্ন থাকলেও বর্তমান আর্থ-সামাজিক অবক্ষয় তাঁদের সেই  পারিবারিক ও সামাজিক মান-মর্যাদা বিনষ্ট করে চলেছে। আজ জীবনযাপনের বিচিত্র পরিসরে বিভিন্ন চাহিদা মেটাতে তাঁদের বাজারমুখী ভূমিকায় অবতীর্ণ হতে হচ্ছে। লক্ষ্মীকান্তপুর, ডায়মন্ডহারবার কিংবা ক্যানিং প্রভৃতি কলকাতাগামী লোকাল ট্রেনে বহুসংখ্যক পরিযায়ী হতদরিদ্র মহিলাদের ভীড়ে  সেই চিত্র পরিষ্কার ফুটে ওঠে। এই প্রতিকূলতার পূর্ণ সুযোগ নিতে দেখা যাচ্ছে কতকগুলো পাশবিক প্রবৃত্তিসম্পন্ন মুখোশধারী ভদ্রলোকের দলের। পৌন্ড্র তথা নিম্নবিত্ত প্রান্তিক পরিবারের মহিলারা আজ  কূচক্রীদের খপ্পরে পড়ে কায়িক ও মানসিক শোষণের নাগপাশে আবদ্ধ।

স্বাধীনতার পর শিক্ষায় সাংবিধানিক অধিকার পেয়ে পৌন্ড্র জনসমাজে শিক্ষিত এক নতুন প্রজাতির সৃষ্টি হয়েছে, তাঁরা কপট নিদ্রায় আচ্ছন্ন থাকতে পছন্দ করেন। এঁদের ভূমিকা ঠিক রাবনের আরেক বেইমান ভাই 'বিভীষণের' মতো। প্রকৃতিগতভাবে আত্মকেন্দ্রিক, সুবিধাবাদী, স্বার্থপর ও সুযোগসন্ধানী এই প্রজাতির মানুষেররা প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও ব্রাহ্মণ্যবাদী মাদকসেবনে অচৈতন্য। স্বসমাজের এঁরা জাতশত্রু-ব্রাহ্মণ্যবাদের একনিষ্ঠ ভক্ত ও গোঁড়া সমর্থক। এঁরা নিজেরাই যেমন আদর্শগতভাবে বিভ্রান্ত, তেমনি স্বসমাজভুক্ত মানুষদের বিপথে পরিচালিত করে বিভ্রাট সৃষ্টিতে ভূমিকা রাখেন। এঁদের সংস্পর্শ ত্যাগ করাই বিধেয়।

মানবজীবনে ধর্মের একটি বিশেষ ভূমিকা আছে-সন্দেহ নেই। কিন্তু ধর্ম যখন মাদকদ্রব্যের ভূমিকা পালন করে, তখন সেই ধর্ম হয়ে যায় সংকীর্ণ, অমানবিক, বিভেদ ও ঘৃণা সৃষ্টিকারী। শোষণমূলক হিংসার জন্ম হয় এইরকম কাল্পনিক ভাববাদী ধর্মের গর্ভগৃহে। একদা "সমতা,মিত্রতা ও অহিংসার" আদর্শ সমন্বিত বৌদ্ধিক ধর্ম-সংস্কৃতি যে জনগোষ্ঠীকে মহত্বের চূড়ায় প্রতিষ্ঠা দিয়েছিল-অতীতের সেই ধর্মীয় গৌরব এখন অস্তমিত।

এই পোন্ড্রগোষ্ঠীভুক্ত সমাজে বেইমান বিভীষণ যেমন আছে, তেমন‌ই স্বদেশপ্রেমী ও স্বজাতিপ্রেমী কুম্ভকর্ণ‌ও আছে। বিভীষণের বেইমানি যেমন তাঁর সহোদর রাবন ধ্বংসের প্রধান কারণ হয়েছিল, তেমনি মাতৃভূমির সার্বভৌমত্ব ও স্বাধীনতা অক্ষুন্ন রাখতে কুম্ভকর্ণ শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধরত অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছেন। নানাবিধ ঢাক-ঢোল,কাঁশি-বাঁশি বাজিয়ে কুম্ভকর্ণের ঘুম ভাঙ্গনো হয়েছিল-এই অকাল নিদ্রাভঙ্গ তাঁর মৃত্যুর কারণও হয়েছিল। আজ হাজারটা ঢাক-ঢোল,কাঁশি-বাঁশি বাজলেও পৌন্ড্র জনগোষ্ঠীর ঘুম আর ভাঙ্গলো না। অকালে প্রাণটা যদি ঝরে যায়! বরং মনুবাদী মাদকসেবনে নিদ্রামগ্ন থাকাই শ্রেয়। কথায় বলে-" আপনি বাঁচলে,বাপের নাম"!!

শ্রীমণি।
 

No comments:

Post a Comment