বহু আন্দোলনের সাক্ষী পূর্ব মেদিনীপুর জেলার নন্দীগ্রাম
থানার আমদাবাদ (মধ্য) গ্ৰামে গত ১লা আগষ্ট ২০২১ রবিবার, প্রয়াত
শ্রীময় সহদেব দাসের প্রয়াণ উপলক্ষ্যে তাঁরই কণিষ্ঠ পুত্র ও অন্যান্য আত্মীয় ও
গ্রামবাসীবৃন্দের উপস্থিতিতে অনুষ্ঠিত হ’লো শ্রাদ্ধের পরিবর্তে শ্রদ্ধা ও
স্মরণসভা।
ব্রাক্ষণ
বর্জিত শ্রাদ্ধের পরিবর্তে শ্রদ্ধানুষ্ঠান চালুর আন্দোলনের ইতিহাসে, পূর্ব মেদিনীপুর জেলা সম্ভবত এই প্রথম ইতিহাসে জাগায়
করে নিল। জায়গা নেওয়াটা খুব সহজ হয়নি সহদেব
বাবুর কনিষ্ঠ পুত্র শ্রীমান অমিয় দাসের পক্ষে। আম্বেদকরবাদ প্রতিষ্ঠা ও সামাজিক
ক্রিয়া কর্ম ব্রাক্ষণবর্জিতভাবে অনুষ্ঠিত হওয়ার বিষয়টি মেনে নিতে পারেননি অমিয় দাসের পরিবারের অন্যান্য অধিকাংশ সদস্যবৃন্দ। পাড়াপ্রতিবেশিদের
পক্ষ থেকেও প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ আসতে থাকে। পিতৃঋণ পরিশোধের জন্য মস্তকমুণ্ডনে
প্রবল চাপ আসে সমস্ত পক্ষ থেকে। আদর্শগত
ভাবে অমিয়বাবু জানতেন যে মস্তক
মুণ্ডিত হওয়া্র অর্থ ব্রাক্ষণ্যবাদকে মেনে নেওয়া। তাই তিনি আদর্শ রক্ষার তাগিদে
প্রবল সামাজিক চাপ উপেক্ষা করেও সিদ্ধান্তে অটল থাকেন। এমনকি শ্রদ্ধানুষ্ঠানের
দিনেও ক্ষৌরকার এনে বলপূর্বক মস্তকমুণ্ডন করাতে চাইলে তিনি আইনের আশ্রয় নেওয়ার
হুমকি দিলে তারা রণে ভঙ্গ দেয়। শিক্ষক হওয়া সত্বেও, গ্ৰাম-সমাজের অনেক মানুষের তুচ্ছ তাচ্ছিল্যকর কথাবার্তা
নীরবে হজম ক’রেও তিনি তাঁর সিদ্ধান্তে অটল
থাকেন। তবে, আত্মীয়স্বজন পাড়া-প্রতিবেশীসহ সমগ্ৰ সমাজের সঙ্গে অসম লড়াই'এ তার সঙ্গ ছাড়েনি গর্ভধারিনী মাতা শ্রীময়ী কবিতা দাস ও মাতৃসম বড়
দিদি শ্রীময়ী কল্পনা মণ্ডল। সন্তান ও ছোট ভাইকে সঙ্গ দেওয়ার ‘অপরাধে’ পরিবারের
বাকিরা এনাদের সবার সঙ্গ ত্যাগ করেন।
অমিয়বাবুর
আহ্বানে সাড়া দিয়ে দক্ষিণ চব্বিশ পরগনা থেকে সামাজিক আন্দোলনের নেতৃত্বদানকারী ডাঃ
প্রদীপ কুমার বর্মণ, অধ্যাপক সুধাকর সরদার, ডাঃ কালাচাঁদ নস্কর, শিক্ষক জয়দেব মণ্ডল ও শিক্ষক মৃত্যুঞ্জয় সরদার ৩১
জুলাই শনিবার রওনা হন মেদিনীপুরের উদ্দেশ্য। পৌঁছে তাঁরা দেখেন অনুষ্ঠান করার মত পরিস্থিতি প্রায় নেই। অনেকটাই আক্রমণের
শিকার হওয়ার মত পরিস্থিতি।
এই দোলাচল চলতে
থাকে ৩১শে জুলাই থেকে অনুষ্ঠান শুরুর পূর্ব মুহুর্ত পর্যন্ত। ইতোমধ্যে খেঁজুরী
থেকে হাজির হন সমাজ সংস্কারক বিশ্বনাথ ঘোড়ুই ও অর্নব কুমার দাস। মাইকের মাধ্যমে
দু’একটি কথা মানুষের কানে পৌঁছনোর পর দু’একজন ক’রে স্থানীয় মানুষ প্রতিরোধ উপেক্ষা
করে হাজির হতে শুরু করেন। অনুষ্ঠানের
প্রাককথন শোনার পরে বারণ বেড়া পেরিয়ে উৎসাহী
নারী-পুরুষ আস্তে আস্তে সভায় চলে আসেন ও সভা পরিপূর্ণ হয়ে ওঠে। ডাঃ প্রদীপ
কুমার বর্মণ তাঁর চিরাচরিত ভাব ও ভাষা সহযোগে শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের অসম্মাজনক দিক
তুলে ধরেন। মূল উদ্যোক্তা শ্রী অমিয় দাস মহাশয় তাঁর পিতার স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বারে, বারে অশ্রুরুদ্ধ হয়ে পড়েন। সমাজের বিভিন্ন কাজে তাঁর পিতার অবদান, তাঁর শিক্ষাদীক্ষাতে পিতার অবদানসহ অন্যান্য নানা দিকে প্রয়াত সহদেববাবুর অবদান তুলে ধরেন যা স্থানীয় মানুষও স্বীকার করেন। পৌণ্ড্র মহাসঙ্ঘের প্রাক্তন সম্পাদক ডাঃ কালাচাঁদ নস্কর মহাশয় সর্বভারতীয়
তথা বাংলার সামাজিক ও ঐতিহাসিক আন্দোলনে মেদিনিপুরের ভুমিপুত্র পৌণ্ড্র মনীষী মণীন্দ্রনাথ মণ্ডল ও মহেন্দ্রনাথ করণের ভুমিকা
তুলে ধরেন এবং শ্রদ্ধানুষ্ঠানটি যে একটি ঐতিহাসিক ঘটনা হতে চলেছে তারও উল্লেখ
করেন। শ্রদ্ধেয় বিশ্বনাথ ঘোড়ুই অনুষ্ঠানটিকে সমাজ সংস্কার আন্দোলনের একটি
অধ্যায় হিসাবে উল্লেখ করেন। অধ্যাপক সুধাকর সরদার ঐতিহাসিকভাবে, ধর্মীয়ভাবে (শাস্ত্রীয়ভাবে),
মানবিকতার প্রেক্ষিতে শ্রাদ্ধানুষ্ঠান কেন করা যায় না তা পরিষ্কার করেন এবং
শ্রদ্ধানুষ্ঠান মানুষকে ভাল মানুষ হতে কিভাবে অনুপ্রাণিত করতে পারে সে বিষয়ে
বক্তব্য রাখেন। সহযোগী সঞ্চালক মৃত্যুঞ্জয় সরদার মহাশয় বক্তব্যের ফাঁকে, ফাঁকে
বিভিন্ন তথ্য দিয়ে সমগ্র অন্যষ্ঠানটিকে একটি মালার মত করে গেঁথে পরিবেশন করেন। ভাবগম্ভীর
পরিবেশে স্মরণসভার ভাবাবেগ উপস্থিত সবাইকে
আবেগমথিত করে।সভায় উপস্থিত যুবসম্প্রদায়কে অতি উৎসাহ নিয়ে অনুষ্ঠের ভিডিও রেকর্ডিং
করতে দেখা যায়। সব দেখা ও শোনার পরে শ্রাদ্ধ নামক অসম্মানজনিত ব্যবস্থা উচ্ছেদের পক্ষে
মত দেন।
সভায়
সভাপতির পদ অলংকৃত করেন দাস পরিবারের বরিষ্ঠ ব্যক্তিত্ব শ্রীযুক্ত বিমল দাস।প্রধান
অতিথি অধ্যাপক সুধাকর সরদার, বিশিষ্ট অতিথি ডাঃ কালাচাঁদ
নস্কর। সভায় উপস্থিত বিশিষ্ট ব্যক্তিবর্গের মধ্যে উল্লেখযোগ্য - বিশ্বনাথ ঘোড়ুই, মানস
কুমার মণ্ডল, অর্নব
কুমার দাস, গিরিজা শঙ্কর কামিলা, শিবশঙ্কর কামিলা, মহিম
দাস, বীরেন্দ্রনাথ
মণ্ডল, বিশ্বনাথ মাইতি, প্রদীপ দাস, মেন
দাস, কিরণ কামিলা, রামহরি মণ্ডল, পলাশ দাস, বাবুলাল কামিলা, টুনীবালা দাসসহ অসংখ্য ব্যক্তিবর্গ। অনুষ্ঠানটির মূল সঞ্চালনা (পৌরহিত্য) করেন ডাঃ প্রদীপ
কুমার বর্মণ। সহযোগী সঞ্চালক ছিলেন শিক্ষক মৃত্যুঞ্জয় সরদার, কথাকার সুরকার শিল্পী হিসাবে সবার মন জয় করেন শিক্ষক
জয়দেব কুমার মণ্ডল। অনুষ্ঠান শেষে সর্বাপেক্ষা বড় পাওনা এত প্রতিবাদ-প্রতিরোধ
উপেক্ষা ক’রে অমীয়বাবু অনুষ্ঠানটি করতে
পেরে যতটুকু সন্তুষ্টি পেয়েছেন সেটুকুই এবং শেষপর্যন্ত তাঁর মায়ের স্নেহাশীষ। এটা
তাঁকে এই সামাজিক আন্দোলনকে আরও বৃহত্তর অংশের মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টায়
নিয়োজিত থাকতে অনুপ্রাণিত করবে বলেই আশা।

















