Sunday, September 24, 2023

প্রয়াত কালাচাঁদ হালদারের প্রতি শ্রদ্ধানিবেদন

প্রয়াত কালাচাঁদ হালদারের স্মরণসভা
তারিখ - ২৪ সেপ্টেম্বর ২০২৩ রবিবার
সময় - সকাল ১০ টা
স্থান - করাবেগ, জয়নগর, দক্ষিণ ২৪ পরগনা

আয়োজক: পুত্র - তপন,তাপস ও বিজন হালদার
পুত্রবধূ - পারুল,স্বপ্না ও বাসন্তী হালদার
কন্যা - শিখা হালদার
নাতিনাতনি - রাহুল,বিতান,শঙ্খ,প্রিয়াঙ্কা, কোয়েল,দীপ্ত ও হিমাদ্রি হালদার

সভাপতি - বিশ্বনাথ হালদার
প্রধান অতিথি - অধ্যাপক সুধাকর সরদার
বিশিষ্ট অতিথি - মোহন মিস্ত্রী, বাসুদেব বেপারী,অসীম কলাতিয়া ও সোমেস সরকার।

প্রধান সঞ্চালক - প্রদীপ কুমার বর্মণ
অলঙ্করণ ও সহযোগী সঞ্চালক - মৃত্যুঞ্জয় সরদার
কবিতা - ভক্তদাস সরদার
সংগীত - জয়দেব কুমার মণ্ডল





















 

Tuesday, August 8, 2023

শ্রদ্ধায়-স্মরণে: শ্রীময় নিরঞ্জন সরদারের দ্বিবার্ষিক স্মরণসভা

প্রতিবেদক: সুদর্শন মণি~~~
    জয়নগর থানার অন্তর্গত বহড়ু অঞ্চল সন্নিহিত কামদেবনগর গ্রামের অধিবাসী মহাপরিনিব্বাণপ্রাপ্ত শ্রীময় নিরঞ্জন সরদারের দ্বিবার্ষিক স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয় গত ০৬/০৮/২০২৩, রবিবার, ১১.৩০ ঘটিকায়। অনুষ্ঠান পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন নিরঞ্জনবাবুর জ্যেষ্ঠ পুত্র গৌতম সরদার, কনিষ্ঠ পুত্র সৌগত সরদার, জ্যেষ্ঠা কন্যা কুন্তলা সরদার ও কনিষ্ঠা কন্যা শকুন্তলা পুরকাইত। উক্ত স্মরণসভার সঞ্চালিকা শ্রীময়ী শকুন্তলা পুরকাইত অনুষ্ঠানের প্রারম্ভে সভাপতি ডাঃ প্রদীপ কুমার বর্মণ, প্রধান অতিথি অধ্যাপক সুধাকর সরদার, বিশিষ্ট অতিথি কানাইলাল মিদ্যে এবং অন্যান্য গণ্যমান্য অতিথিবর্গকে মঞ্চে আহ্বান জানান। প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান পূর্বপুরুষদের নামের তালিকাসহ শুভ্র গন্ধপুষ্পশোভিত মঞ্চে বিরাজমান নিরঞ্জনবাবুর প্রতিকৃতি সমেত তাঁর পিতামাতা, মহামানব বুদ্ধ, মহাজ্ঞানী আম্বেদকর প্রমুখ মহামানবদের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন ও মাল্যার্পণের সাথে সাথেই মূল অনুষ্ঠানের সূচনা হয় অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে। নিরঞ্জনবাবুর সহধর্মিনী শ্রীময়ী অনিমা সরদার প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে স্মৃতিচারণ সম্বন্ধীয় মহৎ অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করেন। 

    শিক্ষক ও গায়ক জয়দেব মন্ডলের উদাত্ত কন্ঠে পরিবেশিত উদ্বোধনী সঙ্গীতের সূত্র ধরে বক্তব্যপর্ব অগ্রসর হতে থাকে। প্রারম্ভিক বক্তা- সকলের প্রিয় বড়দা তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে নিরঞ্জনবাবুর গুণকীর্তনে বলেন, ''নিরঞ্জনবাবু সংশ্লিষ্ট এলাকার অত্যন্ত সজ্জন- একজন প্রথম শিক্ষিত ব্যক্তি। তাঁর উদ্যোগ, ঐকান্তিক আনুকূল্য ও অনুপ্রেরণায় এমন একটি প্রত্যন্ত এলাকার অনেক শিক্ষিত যুবক-যুবতী চাকরি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করে চলেছে।"

নিরঞ্জনবাবুর জ্যেষ্ঠ পুত্র গৌতম সরদার স্মৃতিচারণের প্রারম্ভে অত্যন্ত আবেগতাড়িত হয়ে ওঠেন। ভাইবোনেদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ হবার সুবাদে তাঁর অভিজ্ঞতা-সঞ্জাত স্মৃতিচারণায় নিরঞ্জনবাবুর সারাজীবনের বৈচিত্র্যপূর্ণ দ্বান্দ্বিক টানাপোড়েন ও কর্মকাণ্ডের সাক্ষী হিসেবে বিস্তারিত বিবরণ দিতে চেয়েও সময়াভাবে আকাংখা পূরণে ব্যর্থ হন। নিরঞ্জনবাবুর জ্যেষ্ঠা কন্যা শ্রীময়ী কুন্তলা সরদার তাঁর পিতৃদেবের কৃচ্ছ্রসাধনের ইতিবৃত্ত তুলে ধরে বলেন যে, নিরঞ্জনবাবু অত্যন্ত দুঃসহ কষ্ট স্বীকার করেও তাঁদের যথাযথভাবে মানুষ করেছেন। তখনকার দিনে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে শিক্ষাগ্রহণ ছিল স্বাভাবিক এক অকল্পনীয় ও হাস্যাস্পদ বিষয়। এমতাবস্থায়, শিক্ষানবিশ নিরঞ্জনবাবুকে গ্রামের অনেকের এমনকি নিজের পাড়ার মানুষের কাছেও হাস্যাস্পদ এবং কটুক্তির শিকার হতে হয়েছিল। এতাদৃশ তিক্ত অভিজ্ঞতার নিরীখে সন্তানদের আধপেটা রেখেও শ্রদ্ধেয় নিরঞ্জনবাবু তাদের পড়াশোনার বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ও সুদৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন। 

    সমাজসেবক শিক্ষক মৃত্যুঞ্জয় সরদার তাঁর বক্তব্যে বলেন, নিরঞ্জনবাবু সমর্যাদায় বেঁচে থাকার যে জীবনদর্শন তাঁর জীবনযাপনে উপলব্ধি করেছিলেন, তা উপলব্ধি করলে আর কোনো দর্শনের প্রয়োজন হয়না। তিনি খাদ্যকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনায় গিয়ে বলেন, " আমাদের পূর্বপুরুষরা যে সমস্ত গৌরবজনক অবদান রেখেছেন, তারপরেও আমরা হীনমন্যতায় কেন ভুগছি? তিনি প্রান্তিকের আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত করতে গিয়ে বলেন, "একশ্রেণীর মানুষ এইসব কুসংস্কার তৈরি করে, আমাদের ঠকাচ্ছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান সবটাই আমাদের মানুষের সৃষ্টি সত্ত্বেও আমরা বঞ্চিত। মৃত্যুঞ্জয়বাবু শিক্ষা প্রসারের- বিশেষত মাতৃজাতির শিক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ করে তাঁর বক্তব্য শেষ করেন। 

    নিরঞ্জনবাবুর কনিষ্ঠ পুত্র সৌগত সরদার তার অভূতপূর্ব,অপ্রত্যাশিত ও চমকপ্রদ বক্তব্যে পরমারাধ্য পিতৃদেবের স্মৃতিচারণ করে একটি হৃদয়বিদারক চিঠিতে; যে চিঠির প্রতিটি ছত্রে ছত্রে বাবার প্রতি অব্যক্ত অভিমান,অনুযোগ,অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার ডালি সাজানো হয়েছে থরে থরে। আপনজন প্রকৃতিতে বিলীন হয়েও পরিবার, সন্তান-সন্ততি ও পরিজনদের অন্তরে চিরস্থায়ীভাবে বিরাজমান থাকেন- এই তার দৃঢ়বিশ্বাস। " বাবা! এখন আমি আর ছোট নেই! অনেক দায়িত্বশীল হয়েছি! "--সৌগতর চিঠির এই জাতীয় সকরুণ বক্তব্যের প্রকাশ উপস্থিত অভ্যাগতদের চক্ষুদ্বয় অশ্রুসিক্ত হতে বাধ্য করেছে। এমনকি সঞ্চালিকা শকুন্তলা পুরকাইত ছোটভাই-এর এমন মর্মভেদী স্মৃতিচারণায় অত্যন্ত আবেগতাড়িত হয়ে ওঠেন।

    দুপুর ১২-৪৫ মিনিটে জয়দেববাবুর শ্রদ্ধাসঙ্গীতের পর নিরঞ্জনবাবুর স্মৃতিচারণায় ভাইপো সোমনাথ সরদারের বক্তব্যে শিক্ষার প্রতি জ্যাঠামশায়ের অনুরাগ ও অনুজদের অকৃত্রিম অনুপ্রেরণা দানের প্রসঙ্গ উঠে আসে। শকুন্তলার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, শিক্ষিকা সীমা নস্কর তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তার সাথে নিরঞ্জনবাবুর পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা ও কন্যাসম সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। নিরঞ্জনবাবুর প্রিয় নাতি সন্দীপ সরদার দাদুর সাহচর্যে ইংরেজি ভাষায় পারদর্শিতা অর্জনের কথা অকপটে স্বীকার করে। তার অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায় যে , নিরঞ্জনবাবুর শিক্ষার প্রতি প্রগাঢ় অনুরাগের কারণে, তিনি পড়াশোনার জন্য ঘন্টার পর ঘণ্টা সময় দিতে পরিশ্রান্ত বোধ করতেননা। তাঁর ইংরেজি,বাংলাসহ ভূগোলে গভীর ব্যূৎপত্তি ও জ্ঞানগ্রাহীতার প্রসঙ্গ বারবার উঠে আসে। সন্দীপ নিরঞ্জনবাবুকে তার জীবনের একটি অংশ ও অমূল্য আদর্শ মনে করত। নাতি বিপ্রতীপ সরদার কবিগুরুর 'ধর্মমোহ' কবিতাটি আবৃত্তি করে। ছোট নাতি শুভদীপ সরদারের বক্তব্যে প্রকাশ পায় যে, নিরঞ্জনবাবু সংশ্লিষ্ট কামদেবনগর এলাকার প্রথম মাধ্যমিক পাশ ব্যক্তি ছিলেন।

    সমকালীন বহুজন আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা, শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক ও সুবক্তা অধ্যাপক সুধাকর সরদার অনুষ্ঠানের গতিপ্রকৃতি ও তাৎপর্য সাপেক্ষে তাঁর সাবলীল বক্তব্য উপস্থাপন করে অভ্যাগতবৃন্দের চিত্তাকর্ষণ করেন। তাঁর দর্শন-সম্বন্ধীয় বক্তব্যে বঞ্চিত ও নিগৃহীত সমাজের সামাজিকীকরণ, স্বজনসুলভ মেলবন্ধন, ব্যক্তিগত ও স্ব-সমাজ সংক্রান্ত আলোচনায় বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষায়ন, হীনমন্যতা নিরসন ও বক্তব্য-দানে পারদর্শিতার বাতাবরণ সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি উঠে আসে। তিনি তাৎপর্যপূর্ণভাবে বহুজন ও তথাকথিত উচ্চবর্ণের অন্তর্নিহিত মনস্তাত্ত্বিক প্রভেদের কারণ হিসেবে সাংস্কৃতিক মূলধন বা সম্পদকে (Cultural Capital) দায়ী করেন। পূর্বার্জিত সাংস্কৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ উচ্চবর্ণীয়রা শিক্ষা, সংস্কৃতি, সপ্রতিভতা ও সাবলীল মতপ্রকাশে অত্যন্ত দক্ষ হয়; অন্যদিকে নিম্নবর্ণীয় সমাজ প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সম্পদের অভাবে হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে। তিনি যে কোনও ধরনের কাল্পনিক বিষয়কে কেন্দ্র করে বহুজন সমাজকে বিভিন্ন ধার্মিক উন্মাদনা থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দেন। গভীর অর্থবহুল বক্তব্যের বিষয়বস্তুকে বিভিন্ন আঙ্গিকে পর্যালোচনার সহায়তায় প্রয়াত ব্যক্তির স্মৃতিচারণার যৌক্তিকতা, শিক্ষাবিষয়ক প্রতিকূলতা ও ইংরেজি ভাষায় ব্যূৎপত্তির উপর গুরুত্ব আরোপ করে সুধাকরবাবু তাঁর বক্তব্য শেষ করেন। 

    ইত্যবসরে নিরঞ্জনবাবুর স্মৃতিরক্ষার্থে তাঁর সহধর্মিণী শ্রীময়ী অনিমা সরদারের সৌজন্য ও অনুপ্রেরণায় সামাজিক ঋণের (Pay back to the Society) নৈতিক দায়বদ্ধতার স্বীকৃতিস্বরূপ সঞ্চালিকা শকুন্তলা পুরকাইত ও তার ভাইবোনেদের যৌথ উদ্যোগে 'সৌম্যজিত দাস' নামে এক দুঃস্থ ছাত্রসহ পাড়ার দুঃস্থ ছাত্রছাত্রীদের সাধ্যমতো আর্থিক অনুদানের অঙ্গীকারবদ্ধতার প্রসঙ্গ ঘোষণা করা হয় সংশ্লিষ্ট সভামঞ্চ থেকে।

    বিশিষ্ট শিশু-চিকিৎসক ডাঃ রবীন নস্কর তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানকে বহুজন আন্দোলনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে গুরুত্বারোপ করেন। তিনি প্রাসঙ্গিক কারণে ব্যক্তিগতভাবে মনুবাদী দাসত্বের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে তাঁর বাবা- মায়ের শ্রদ্ধানুষ্ঠান, সন্তানের অন্নপ্রাশন সহ যাবতীয় পুরোহিতবর্জিত মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান পালন করেছেন। আর একজন বিশিষ্ট অতিথি, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী রামবাবু প্রতিটি গ্রামাঞ্চলে এরূপই পুরোহিতবর্জিত মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের সপক্ষে ওকালতি করেন।
সমগ্র অনুষ্ঠানটি অকুন্ঠচিত্তে ও পরিমার্জিত ভাষায় সঞ্চালনা করেন নিরঞ্জনবাবুর কনিষ্ঠা কন্যা, ভারতীয় জীবনবীমা নিগমের প্রথম শ্রেণীর আধিকারিক শ্রীময়ী শকুন্তলা পুরকাইত। তিনি আনুষ্ঠানিক প্রাসঙ্গিকতা ও বক্তাদের বক্তব্যের সারাংশসহ অত্যন্ত সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করে স্মৃতিচারণার মাহাত্ম্যকে উচ্চস্তরে পৌঁছে দিয়েছেন। 

    পরিশেষে শ্রদ্ধেয় নিরঞ্জনবাবুর স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট সভাপতি কবি, সাহিত্যিক, সমাজসংস্কারক, সুবক্তা, চক্ষু-চিকিৎসক ডাঃ প্রদীপ কুমার বর্মণ তাঁর সমাপ্তি-ভাষণে ছোট ছোট বস্তুনিষ্ঠ গল্প অবলম্বনে স্মরণানুষ্ঠানের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন, ধর্মান্ধতা পেরিয়ে বহুজনকে উচ্চবর্ণীয় যুবক-যুবতীদের অনুকরণে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার পরামর্শ দেন ;সেইসঙ্গে সভাপতির দায়বদ্ধতা থেকে বিভিন্ন বক্তার বক্তব্যের নির্যাস থেকে উপস্থিত অভ্যাগতদের আলোকিত করে প্রয়াত নিরঞ্জনবাবুর স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘোষণা করেন। অবশেষে জয়দেববাবুর জাগরণী সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে এমন পবিত্র একটি মনোগ্রাহী অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘটে বিকাল সাড়ে তিন ঘটিকায়।



















 

Monday, July 24, 2023

১৫-তম স্বজনমিলন উৎসব উদযাপন

পৌন্ড্র মহাসংঘ আয়োজিত ১৫-তম স্বজনমিলন উৎসব উদযাপন

                   প্রতিবেদকঃ সুদর্শন মণি  

গত ২২-শে জুলাই ২০২৩, শনিবার, পৌন্ড্র মহাসংঘ আয়োজিত ১৫-তম স্বজনমিলন উৎসব সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয় বারুইপুর শহরের অন্তর্গত বেলতলার 'তেরোপার্বণ' সভাঘরে। শ্রাবণী-বর্ষার যাবতীয় ভ্রুকুটি অগ্রাহ্য করে স্থানীয় স্বজনবর্গ ও শুভানুধ্যায়ীদের হার্দিক উদ্যোগ, প্রচেষ্টা এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলাসমূহ থেকে আগত প্রায় একশোজন স্বজনবর্গ ও অভ্যাগত অতিথিবৃন্দের উপস্থিতিতে মহাসংঘের পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে এই মহতী অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন ঘটে সকাল সাড়ে দশটায়। স্বাজাত্যবোধ- উদ্রেককারী স্লোগান সহকারে পতাকা উত্তোলন করেন মহাসংঘের বর্তমান সভাপতি মাননীয় মেঘনাথ হালদার মহাশয়। পৌন্ড্র মনীষাসহ বহুজন মনীষীদের  প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য ও মাল্যার্পণের অব্যবহিত পরেই অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বটি অনুষ্ঠিত হতে থাকে মহাসংঘের বর্তমান পরিচালন সমিতির সহকারী সম্পাদক শ্রীমান সুব্রত সরদারের দক্ষ পরিচালনায়। তিনি অনুষ্ঠানের সম্মানীয় সভাপতি মেঘনাদ হালদার এবং বিশিষ্ট অতিথিবর্গকে মঞ্চে আসন গ্রহণের জন্য আহ্বান জানান।   

প্রবীন সঙ্গীতশিল্পী মাননীয় হারাধন রায় কর্তৃক সুশ্রাব্য উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন এবং সভাপতি প্রদত্ত স্বাগত ভাষণের অব্যবহিত পর সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানের বিশেষ কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত অধ্যাপক (ডঃ) সনৎকুমার নস্কর ও সুব্রত সরদারের যুগ্ম সম্পাদনা এবং পৌন্ড্র মহাসংঘের প্রকাশনায় "পৌন্ড্র-মনীষা, ৯ম খন্ডের" আবরণ উন্মোচনের পাশাপাশি অভূতপূর্ব সামাজিক দায়বদ্ধতা ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ চারজন বিশিষ্ট পৌন্ড্র- ব্যক্তিবর্গকে মানপত্র সহকারে বিশেষ সম্মাননা প্রদানের সূত্রে প্রথম পর্বটি সঞ্চালিত হতে থাকে। 'পৌন্ড্র মনীষা, ৯ম খন্ডের' আবরণ উন্মোচন করেন বিশিষ্ট অতিথি ডাঃ প্রদীপ কুমার বর্মণ মহাশয়। দুইজন পৌন্ড্র মনীষী সংকলিত লুপ্তপ্রায় কয়েকটি  গ্রন্থের (বিশেষত নরোত্তম হালদার মহাশয় সংকলিত গঙ্গারিডি ইতিহাস ও সংস্কৃতির উপকরণ, তাম্রলিপ্ত-গঙ্গারিডি-সুন্দরবন এবং পেরিপ্লাস অব দ্য ইরিথ্রিয়ান সী (অনুবাদ) মূল্যবান গ্রন্থ) পরিচয়জ্ঞাপন, তাৎপর্য ও অপরিসীম গুরুত্ব পর্যালোচনা করেন ডঃ সনৎকুমার নস্কর। সারা ভারতসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে উচ্চ-প্রশংসিত ও পুরস্কৃত আধুনিক কাঠি-পুতুলনাচ শিল্পী ও পরিচালক মাননীয় নিরাপদ মন্ডল, প্রবীন গাজন-গানের লেখক, সঙ্গীত পরিচালক ও বিশিষ্ট আম্বেদকরবাদী মাননীয় হারাধন রায়, সমকালীন বহুজনমুক্তি আন্দোলনের অক্লান্ত অধিনায়িকা ও অকুতোভয় সুলেখিকা শ্রীময়ী স্বস্তি সরদার ভৌমিক এবং দক্ষিণবঙ্গের স্বতন্ত্র লোকসংস্কৃতির অন্যতম বিশিষ্ট কর্ণধার মাননীয় ক্ষুদিরাম পুরকাইতবাবুর হাতে সদ্য-প্রকাশিত 'পৌন্ড্র-মনীষা, ৯ম খন্ডের একটি করে প্রতিলিপি সমেত মানপত্র প্রদান করে সম্মাননা প্রদান করা হয়। সম্মানিত মানপত্র প্রাপকগণ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের উপর তাঁদের মূল্যবান বক্তব্য উপস্থাপন করে উপস্থিত স্বজনদের আলোকিত করেন। মানপত্রগুলি বাঁধানোর দায়িত্ব যত্নসহকারে পালন করেন মহাসংঘের কার্যনির্বাহী সমিতির অন্যতম প্রধান সদস্য মাননীয় কালাচাঁদ নস্কর মহাশয়।

পৌন্ড্র-জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক, শৈক্ষিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়-সম্বলিত প্রথম পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত "বাবাসাহেবের বহুজনমুক্তি ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের নিরীখে পৌন্ড্র মহাসংঘের সচেতন ভূমিকা"র মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর সবিশেষ আলোকপাত করেন মাননীয় মেঘনাথ হালদার মহাশয়। 'পৌন্ড্র জনগোষ্ঠীর বর্তমান নিদ্রামগ্ন অবস্থান এবং এহেন দুর্দশা থেকে উত্তোরণের উপায় অন্বেষণের' মতো জটিলতম একটি বিষয়ের ওপর মনোজ্ঞ বিশ্লেষণে উপস্থিত স্বজনবর্গকে চিন্তাঋদ্ধ ,উৎসাহিত ও উদ্দীপিত করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক (ডঃ) সনৎকুমার নস্কর মহাশয়। 'সুন্দরবনবাসী পৌন্ড্র-আন্দোলনের সেকাল ও একাল' সম্পর্কিত জাগরণ উদ্রেককারী আলোচনার প্রারম্ভে শ্লেষাত্মক হতাশা প্রকাশ করেন সমকালীন বহুজনমুক্তি আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত, সমাজসংস্কারক, বিশিষ্ট দলিত-সাহিত্যিক ও স্পষ্টবক্তা মাননীয় ডাঃ প্রদীপ কুমার বর্মন মহাশয়। তিনি বহুজনমুক্তি আন্দোলনে সংগঠিতভাবে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য সমকালীন যুবসমাজের প্রতি আহ্বান জানান। উপস্থিত শ্রোতৃবর্গ তাঁর ঝাঁঝালো আলোচনায় স্বভাবতঃই অপ্রতিভ বোধ করলেও মানসিকভাবে উদ্দীপিত বোধ করেন। পরবর্তী আলোচক পৌন্ড্র শিল্পপতি দেবাশীষ মন্ডলের বক্তব্যে মূলত বেকার স্বজনদের জীবন-জীবিকার উপায় অন্বেষণের বিষয়টি আলোকিত হয়। তিনি বেকার যুবক-যুবতীদের ব্যাঙ্কঋণ মারফৎ বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় মনোনিবেশের পরামর্শ দেন এবং এব্যাপারে কেউ উদ্যোগি হলে সাহায্যের ঋণ সংগ্রহের বিষয়ে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন।    

মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পর দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনা শুরু হয় ভারতীয় জীবনবীমা নিগমের প্রথম শ্রেণীভুক্ত আধিকারিক, সংবেদনশীল, সমাজদরদী ও সমাজকল্যাণে নিষ্ঠাবতী শ্রীময়ী শকুন্তলা পুরকাইতের সহজ-সরল ও সাবলীল বক্তব্য উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে। মিষ্টভাষিণী শকুন্তলা তাঁর বক্তব্যে প্রধানত পৌন্ড্র মহিলাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতার উপর আলোকপাত করেন। তৎকালীন বিশিষ্ট দুইজন পৌন্ড্র সমাজসেবী ও বীরাঙ্গনা নারী-মন্দিরবাজার অঞ্চলের বাসিন্দা 'হাউড়িদেবী' এবং 'তেভাগা আন্দোলনে' অংশগ্রহণকারী বীরাঙ্গনা, সুন্দরবন এলাকায় ভূমিপুত্রী 'সৌরভী মন্ডলের ' অপরিসীম অবদান ও আত্মত্যাগের নিদর্শন তুলে ধরেন। সাথে সাথে পৌন্ড্র মহিলাদের বিজ্ঞানমনস্ক হতে আবেদন রাখেন। বিশিষ্ট আম্বেদকরবাদী ভগিনীদ্বয় স্বস্তি ও রূপা সরদার, প্রবীণ সমাজসেবক মাননীয় নির্মল সরদার, পৌন্ড্র মহাসংঘের পরিচালন সমিতির সদস্যা মাননীয়া মিনতি সরদার প্রমুখ তাঁদের নাতিদীর্ঘ বক্তব্যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিশুদের মানসিক বিকাশ ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বহুজন আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য স্বজনদের আহ্বান জানান। ইত্যবসরে পৌন্ড্র জনগোষ্ঠীর অতীত সংস্কৃতি বিষয়ক সঙ্গীত, কবিতা ও বিশ্বরত্ন ডঃ আম্বেদকরের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য-সংগীত উপস্থাপনায় শ্রোতৃবর্গকে রোমাঞ্চিত করে তাঁদের মানসিক আনন্দ ও উৎসাহ বর্ধন করেন যথাক্রমে সঙ্গীতশিল্পী জয়দেব মন্ডল, গোষ্টবিহারী নস্কর ও ভক্তরাম সরদার। বিশেষভাবে উল্লেখনীয় শিক্ষক জয়দেব মন্ডল রচিত, সুরারোপিত পৌণ্ড্রদের গৌরবোজ্জ্বল অতীত ইতিহাসের উপর তাঁরই গাওয়া গানটি যা একটি দলিল হিসাবে বিবেচিত হতে পার। সমকালীন বহুজনমুক্তি ও আম্বেদকরবাদী  আন্দোলনের প্রথম সারির নেতৃত্বদানকারী, দার্শনিক, সমাজহিতৈষী, বিচারশীল এবং আকর্ষণীয়-সুবক্তা, আচার্য্য জগদীশচন্দ্র বোস বিকলেজের অধ্যাপক সুধাকর সরদারের বহুপ্রতিক্ষিত বক্তব্যটি উপস্থাপিত হয়। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়টি ছিল 'ভারতের দলিত আন্দোলনের বর্তমান প্রেক্ষাপট'। তিনি বিখ্যাত চিন্তাবিদদের ও বাবাসাহেবের গবেষণাধর্মী গ্রন্থের বিভিন্ন উদ্ধৃতির সহায়তায় শ্রোতৃবর্গকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, প্রাচীন পৃথিবীর বিভিন্ন  দেশে রাজনৈতিক বিপ্লবের পূর্বে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। দলিত রাজনৈতিক চিন্তাবিদদের সেখানেই বিশেষ ভূমিকা পালনের অপ্রতুলতা দেখা যাচ্ছে। তাঁর মতে, পৌন্ড্র তথা সমগ্র বহুজন সমাজকে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পথে অগ্রসর হয়ে সংগঠিত-সক্রিয়তা গ্রহণের জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন যে, দলিত আন্দোলনের সফলতার জন্য প্রতিপক্ষ হিসাবে লক্ষ্যের কেন্দ্রে আনতে হবে ব্রাহ্মণ্যবাদিদেরকে যারা সংরক্ষণ থেকে শিক্ষা,সম্মানীয় সামাজিক অবস্থান, সম্পত্তি সবই গ্রাস করে নিচ্ছে। কিন্তু, স্বার্থান্বেষীরা সেই প্রতিপক্ষের জায়গায় দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে  উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেখানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে যাতে দলিত আন্দোলন লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছে। তাঁর হৃদয়গ্রাহী ও অন্তর্দৃষ্টিপ্রসূত এইরূপ স্বাবলীল বক্তব্যে সম্মানীয় শ্রোতৃবর্গ অতিশয় সমৃদ্ধ, উদ্দীপিত ও উৎসাহিত হয়ে ওঠেন।

চা পানের বিরতির পর পুনরায় আলোচনা সভার শুরু হয় তথ্যচিত্র নির্মাতা সইফুর রহমানের বক্তব্যে। তিনি সংগঠিত রাজনৈতিক আন্দোলনের সহায়তায় ব্যবস্থা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। অল ইন্ডিয়া জিএসটি সেন্ট্রাল সার্ভিস এ্যান্ড ওয়েস্ট বেঙ্গল কাস্টমস বিভাগের এসসি,এসটি ও ওবিসি ইউনিয়নের সভাপতি মাননীয় গৌর নস্করের বক্তব্যের পর সমাজসংস্কার আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা-ব্যক্তিত্ব, শিক্ষক মৃত্যুঞ্জয় সরদার তাঁর বক্তব্যের ভাবার্থের মধ্য দিয়ে পৌন্ড্র জনগোষ্ঠীর ধর্মাচরণের বিষয়ে অযৌক্তিক ভাবনা থেকে বেরিয়ে যৌক্তিকভাবে ইতিবাদী হতে আহ্বান জানান। তরুণ প্রজন্মের অধ্যাপক কার্তিক মন্ডল পৌন্ড্র জনগোষ্ঠী তথা সমগ্র দলিত মানুষের শিক্ষা ও সচেতনতার হার বৃদ্ধির জন্য মাসিক বা পাক্ষিক পৌন্ড্র সমাচার প্রকাশের প্রস্তাব দেন। পৌন্ড্র মহাসংঘের কার্যকরী সমিতির সদস্য মাননীয় বৃন্দাবন নস্করের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে পুরোহিতবর্জিত শ্রদ্ধানুষ্ঠানের বিষয়টি আলোকিত হয়। শেষ পর্যায়ে মাননীয় সুজিত পুরকাইত, পৌন্ড্র মহাসংঘের বর্তমান সম্পাদক মাননীয় দুলালচন্দ্র সরদার প্রমুখ সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। বক্তব্যের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রাসঙ্গিক টিপ্পণীর উপস্থাপনায় বক্তব্যের গুরুত্ব বর্ধন অব্যহত রাখেন অনুষ্ঠানের সঞ্চালক সুব্রত সরদার।স্বজনমিলন অনুষ্ঠানের সর্বশেষ আকর্ষণ ছিল শ্রতিমধুর সঙ্গীত পরিবেশন। সুকণ্ঠী শিক্ষিকা মাননীয়া সীমা নস্কর পরিবেশিত সঙ্গীতের সুর-মূর্ছনায় সমস্ত সভাঘরটি উদ্বেলিত ও উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। বিশেষ এই অনুষ্ঠানটি সুচারুভাবে পরিচালনা ও সম্পন্ন করেন তরুণ উপস্থাপক শ্রীমান সুব্রত সরদার। পরিশেষে সর্বস্তরের স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের ঐকান্তিক সহযোগিতা ও প্রচেষ্টায় পৌন্ড্র মহাসংঘ আয়োজিত ১৫-তম স্বজনমিলন অনুষ্ঠানটি সফলভাবে সম্পন্ন হওয়াতে, অনুষ্ঠানের সভাপতি স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন; এবং ধন্যবাদজ্ঞাপক ভাষণের পর অনুষ্ঠানটির পরিসমাপ্তি ঘোষিত হয়।

 **প্রতিবেদন প্রস্তুতির প্রয়োজনে পর্যায়ক্রমিক তথ্যের যোগান দিয়ে সহায়তা করেন অধ্যাপক সুধাকর সরদার।** 

দুঃখিত, কিছু ভিডিও আপলোড করা গেল না, সাইজ বড় হওয়ার জন্য।