প্রতিবেদক: সুদর্শন মণি~~~জয়নগর থানার অন্তর্গত বহড়ু অঞ্চল সন্নিহিত কামদেবনগর গ্রামের অধিবাসী মহাপরিনিব্বাণপ্রাপ্ত শ্রীময় নিরঞ্জন সরদারের দ্বিবার্ষিক স্মরণসভা অনুষ্ঠিত হয় গত ০৬/০৮/২০২৩, রবিবার, ১১.৩০ ঘটিকায়। অনুষ্ঠান পালনের উদ্যোগ গ্রহণ করেন নিরঞ্জনবাবুর জ্যেষ্ঠ পুত্র গৌতম সরদার, কনিষ্ঠ পুত্র সৌগত সরদার, জ্যেষ্ঠা কন্যা কুন্তলা সরদার ও কনিষ্ঠা কন্যা শকুন্তলা পুরকাইত। উক্ত স্মরণসভার সঞ্চালিকা শ্রীময়ী শকুন্তলা পুরকাইত অনুষ্ঠানের প্রারম্ভে সভাপতি ডাঃ প্রদীপ কুমার বর্মণ, প্রধান অতিথি অধ্যাপক সুধাকর সরদার, বিশিষ্ট অতিথি কানাইলাল মিদ্যে এবং অন্যান্য গণ্যমান্য অতিথিবর্গকে মঞ্চে আহ্বান জানান। প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মধ্য দিয়ে দৃশ্যমান পূর্বপুরুষদের নামের তালিকাসহ শুভ্র গন্ধপুষ্পশোভিত মঞ্চে বিরাজমান নিরঞ্জনবাবুর প্রতিকৃতি সমেত তাঁর পিতামাতা, মহামানব বুদ্ধ, মহাজ্ঞানী আম্বেদকর প্রমুখ মহামানবদের প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদন ও মাল্যার্পণের সাথে সাথেই মূল অনুষ্ঠানের সূচনা হয় অত্যন্ত ভাবগম্ভীর পরিবেশে। নিরঞ্জনবাবুর সহধর্মিনী শ্রীময়ী অনিমা সরদার প্রদীপ প্রজ্জ্বলন করে স্মৃতিচারণ সম্বন্ধীয় মহৎ অনুষ্ঠানটি উদ্বোধন করেন।শিক্ষক ও গায়ক জয়দেব মন্ডলের উদাত্ত কন্ঠে পরিবেশিত উদ্বোধনী সঙ্গীতের সূত্র ধরে বক্তব্যপর্ব অগ্রসর হতে থাকে। প্রারম্ভিক বক্তা- সকলের প্রিয় বড়দা তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে নিরঞ্জনবাবুর গুণকীর্তনে বলেন, ''নিরঞ্জনবাবু সংশ্লিষ্ট এলাকার অত্যন্ত সজ্জন- একজন প্রথম শিক্ষিত ব্যক্তি। তাঁর উদ্যোগ, ঐকান্তিক আনুকূল্য ও অনুপ্রেরণায় এমন একটি প্রত্যন্ত এলাকার অনেক শিক্ষিত যুবক-যুবতী চাকরি প্রাপ্তির ক্ষেত্রে সাফল্য অর্জন করে চলেছে।"নিরঞ্জনবাবুর জ্যেষ্ঠ পুত্র গৌতম সরদার স্মৃতিচারণের প্রারম্ভে অত্যন্ত আবেগতাড়িত হয়ে ওঠেন। ভাইবোনেদের মধ্যে জ্যেষ্ঠ হবার সুবাদে তাঁর অভিজ্ঞতা-সঞ্জাত স্মৃতিচারণায় নিরঞ্জনবাবুর সারাজীবনের বৈচিত্র্যপূর্ণ দ্বান্দ্বিক টানাপোড়েন ও কর্মকাণ্ডের সাক্ষী হিসেবে বিস্তারিত বিবরণ দিতে চেয়েও সময়াভাবে আকাংখা পূরণে ব্যর্থ হন। নিরঞ্জনবাবুর জ্যেষ্ঠা কন্যা শ্রীময়ী কুন্তলা সরদার তাঁর পিতৃদেবের কৃচ্ছ্রসাধনের ইতিবৃত্ত তুলে ধরে বলেন যে, নিরঞ্জনবাবু অত্যন্ত দুঃসহ কষ্ট স্বীকার করেও তাঁদের যথাযথভাবে মানুষ করেছেন। তখনকার দিনে প্রত্যন্ত গ্রামাঞ্চলে শিক্ষাগ্রহণ ছিল স্বাভাবিক এক অকল্পনীয় ও হাস্যাস্পদ বিষয়। এমতাবস্থায়, শিক্ষানবিশ নিরঞ্জনবাবুকে গ্রামের অনেকের এমনকি নিজের পাড়ার মানুষের কাছেও হাস্যাস্পদ এবং কটুক্তির শিকার হতে হয়েছিল। এতাদৃশ তিক্ত অভিজ্ঞতার নিরীখে সন্তানদের আধপেটা রেখেও শ্রদ্ধেয় নিরঞ্জনবাবু তাদের পড়াশোনার বিষয়ে অত্যন্ত কঠোর ও সুদৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছিলেন।সমাজসেবক শিক্ষক মৃত্যুঞ্জয় সরদার তাঁর বক্তব্যে বলেন, নিরঞ্জনবাবু সমর্যাদায় বেঁচে থাকার যে জীবনদর্শন তাঁর জীবনযাপনে উপলব্ধি করেছিলেন, তা উপলব্ধি করলে আর কোনো দর্শনের প্রয়োজন হয়না। তিনি খাদ্যকে গুরুত্ব দিয়ে আলোচনায় গিয়ে বলেন, " আমাদের পূর্বপুরুষরা যে সমস্ত গৌরবজনক অবদান রেখেছেন, তারপরেও আমরা হীনমন্যতায় কেন ভুগছি? তিনি প্রান্তিকের আত্মসম্মানবোধ জাগ্রত করতে গিয়ে বলেন, "একশ্রেণীর মানুষ এইসব কুসংস্কার তৈরি করে, আমাদের ঠকাচ্ছে। খাদ্য, বস্ত্র, বাসস্থান সবটাই আমাদের মানুষের সৃষ্টি সত্ত্বেও আমরা বঞ্চিত। মৃত্যুঞ্জয়বাবু শিক্ষা প্রসারের- বিশেষত মাতৃজাতির শিক্ষার উপর গুরুত্ব আরোপ করে তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।নিরঞ্জনবাবুর কনিষ্ঠ পুত্র সৌগত সরদার তার অভূতপূর্ব,অপ্রত্যাশিত ও চমকপ্রদ বক্তব্যে পরমারাধ্য পিতৃদেবের স্মৃতিচারণ করে একটি হৃদয়বিদারক চিঠিতে; যে চিঠির প্রতিটি ছত্রে ছত্রে বাবার প্রতি অব্যক্ত অভিমান,অনুযোগ,অকৃত্রিম ভালোবাসা ও শ্রদ্ধার ডালি সাজানো হয়েছে থরে থরে। আপনজন প্রকৃতিতে বিলীন হয়েও পরিবার, সন্তান-সন্ততি ও পরিজনদের অন্তরে চিরস্থায়ীভাবে বিরাজমান থাকেন- এই তার দৃঢ়বিশ্বাস। " বাবা! এখন আমি আর ছোট নেই! অনেক দায়িত্বশীল হয়েছি! "--সৌগতর চিঠির এই জাতীয় সকরুণ বক্তব্যের প্রকাশ উপস্থিত অভ্যাগতদের চক্ষুদ্বয় অশ্রুসিক্ত হতে বাধ্য করেছে। এমনকি সঞ্চালিকা শকুন্তলা পুরকাইত ছোটভাই-এর এমন মর্মভেদী স্মৃতিচারণায় অত্যন্ত আবেগতাড়িত হয়ে ওঠেন।দুপুর ১২-৪৫ মিনিটে জয়দেববাবুর শ্রদ্ধাসঙ্গীতের পর নিরঞ্জনবাবুর স্মৃতিচারণায় ভাইপো সোমনাথ সরদারের বক্তব্যে শিক্ষার প্রতি জ্যাঠামশায়ের অনুরাগ ও অনুজদের অকৃত্রিম অনুপ্রেরণা দানের প্রসঙ্গ উঠে আসে। শকুন্তলার ঘনিষ্ঠ বন্ধু, শিক্ষিকা সীমা নস্কর তার সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে তার সাথে নিরঞ্জনবাবুর পারিবারিক ঘনিষ্ঠতা ও কন্যাসম সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। নিরঞ্জনবাবুর প্রিয় নাতি সন্দীপ সরদার দাদুর সাহচর্যে ইংরেজি ভাষায় পারদর্শিতা অর্জনের কথা অকপটে স্বীকার করে। তার অভিজ্ঞতা থেকে জানা যায় যে , নিরঞ্জনবাবুর শিক্ষার প্রতি প্রগাঢ় অনুরাগের কারণে, তিনি পড়াশোনার জন্য ঘন্টার পর ঘণ্টা সময় দিতে পরিশ্রান্ত বোধ করতেননা। তাঁর ইংরেজি,বাংলাসহ ভূগোলে গভীর ব্যূৎপত্তি ও জ্ঞানগ্রাহীতার প্রসঙ্গ বারবার উঠে আসে। সন্দীপ নিরঞ্জনবাবুকে তার জীবনের একটি অংশ ও অমূল্য আদর্শ মনে করত। নাতি বিপ্রতীপ সরদার কবিগুরুর 'ধর্মমোহ' কবিতাটি আবৃত্তি করে। ছোট নাতি শুভদীপ সরদারের বক্তব্যে প্রকাশ পায় যে, নিরঞ্জনবাবু সংশ্লিষ্ট কামদেবনগর এলাকার প্রথম মাধ্যমিক পাশ ব্যক্তি ছিলেন।সমকালীন বহুজন আন্দোলনের অন্যতম প্রধান প্রবক্তা, শিক্ষাবিদ, সমাজসংস্কারক ও সুবক্তা অধ্যাপক সুধাকর সরদার অনুষ্ঠানের গতিপ্রকৃতি ও তাৎপর্য সাপেক্ষে তাঁর সাবলীল বক্তব্য উপস্থাপন করে অভ্যাগতবৃন্দের চিত্তাকর্ষণ করেন। তাঁর দর্শন-সম্বন্ধীয় বক্তব্যে বঞ্চিত ও নিগৃহীত সমাজের সামাজিকীকরণ, স্বজনসুলভ মেলবন্ধন, ব্যক্তিগত ও স্ব-সমাজ সংক্রান্ত আলোচনায় বর্তমান প্রজন্মের শিক্ষায়ন, হীনমন্যতা নিরসন ও বক্তব্য-দানে পারদর্শিতার বাতাবরণ সৃষ্টির গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলি উঠে আসে। তিনি তাৎপর্যপূর্ণভাবে বহুজন ও তথাকথিত উচ্চবর্ণের অন্তর্নিহিত মনস্তাত্ত্বিক প্রভেদের কারণ হিসেবে সাংস্কৃতিক মূলধন বা সম্পদকে (Cultural Capital) দায়ী করেন। পূর্বার্জিত সাংস্কৃতিক সম্পদে সমৃদ্ধ উচ্চবর্ণীয়রা শিক্ষা, সংস্কৃতি, সপ্রতিভতা ও সাবলীল মতপ্রকাশে অত্যন্ত দক্ষ হয়; অন্যদিকে নিম্নবর্ণীয় সমাজ প্রগতিশীল সাংস্কৃতিক সম্পদের অভাবে হীনমন্যতায় ভুগতে থাকে। তিনি যে কোনও ধরনের কাল্পনিক বিষয়কে কেন্দ্র করে বহুজন সমাজকে বিভিন্ন ধার্মিক উন্মাদনা থেকে বিরত থাকতে পরামর্শ দেন। গভীর অর্থবহুল বক্তব্যের বিষয়বস্তুকে বিভিন্ন আঙ্গিকে পর্যালোচনার সহায়তায় প্রয়াত ব্যক্তির স্মৃতিচারণার যৌক্তিকতা, শিক্ষাবিষয়ক প্রতিকূলতা ও ইংরেজি ভাষায় ব্যূৎপত্তির উপর গুরুত্ব আরোপ করে সুধাকরবাবু তাঁর বক্তব্য শেষ করেন।ইত্যবসরে নিরঞ্জনবাবুর স্মৃতিরক্ষার্থে তাঁর সহধর্মিণী শ্রীময়ী অনিমা সরদারের সৌজন্য ও অনুপ্রেরণায় সামাজিক ঋণের (Pay back to the Society) নৈতিক দায়বদ্ধতার স্বীকৃতিস্বরূপ সঞ্চালিকা শকুন্তলা পুরকাইত ও তার ভাইবোনেদের যৌথ উদ্যোগে 'সৌম্যজিত দাস' নামে এক দুঃস্থ ছাত্রসহ পাড়ার দুঃস্থ ছাত্রছাত্রীদের সাধ্যমতো আর্থিক অনুদানের অঙ্গীকারবদ্ধতার প্রসঙ্গ ঘোষণা করা হয় সংশ্লিষ্ট সভামঞ্চ থেকে।বিশিষ্ট শিশু-চিকিৎসক ডাঃ রবীন নস্কর তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানকে বহুজন আন্দোলনের অন্যতম মাধ্যম হিসেবে গুরুত্বারোপ করেন। তিনি প্রাসঙ্গিক কারণে ব্যক্তিগতভাবে মনুবাদী দাসত্বের ঘেরাটোপ থেকে বেরিয়ে তাঁর বাবা- মায়ের শ্রদ্ধানুষ্ঠান, সন্তানের অন্নপ্রাশন সহ যাবতীয় পুরোহিতবর্জিত মাঙ্গলিক অনুষ্ঠান পালন করেছেন। আর একজন বিশিষ্ট অতিথি, অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মী রামবাবু প্রতিটি গ্রামাঞ্চলে এরূপই পুরোহিতবর্জিত মাঙ্গলিক অনুষ্ঠানের সপক্ষে ওকালতি করেন।সমগ্র অনুষ্ঠানটি অকুন্ঠচিত্তে ও পরিমার্জিত ভাষায় সঞ্চালনা করেন নিরঞ্জনবাবুর কনিষ্ঠা কন্যা, ভারতীয় জীবনবীমা নিগমের প্রথম শ্রেণীর আধিকারিক শ্রীময়ী শকুন্তলা পুরকাইত। তিনি আনুষ্ঠানিক প্রাসঙ্গিকতা ও বক্তাদের বক্তব্যের সারাংশসহ অত্যন্ত সুচিন্তিত মতামত ব্যক্ত করে স্মৃতিচারণার মাহাত্ম্যকে উচ্চস্তরে পৌঁছে দিয়েছেন।পরিশেষে শ্রদ্ধেয় নিরঞ্জনবাবুর স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানের সংশ্লিষ্ট সভাপতি কবি, সাহিত্যিক, সমাজসংস্কারক, সুবক্তা, চক্ষু-চিকিৎসক ডাঃ প্রদীপ কুমার বর্মণ তাঁর সমাপ্তি-ভাষণে ছোট ছোট বস্তুনিষ্ঠ গল্প অবলম্বনে স্মরণানুষ্ঠানের তাৎপর্য ব্যাখ্যা করেন, ধর্মান্ধতা পেরিয়ে বহুজনকে উচ্চবর্ণীয় যুবক-যুবতীদের অনুকরণে আধুনিক শিক্ষায় শিক্ষিত হওয়ার পরামর্শ দেন ;সেইসঙ্গে সভাপতির দায়বদ্ধতা থেকে বিভিন্ন বক্তার বক্তব্যের নির্যাস থেকে উপস্থিত অভ্যাগতদের আলোকিত করে প্রয়াত নিরঞ্জনবাবুর স্মৃতিচারণ অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘোষণা করেন। অবশেষে জয়দেববাবুর জাগরণী সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে এমন পবিত্র একটি মনোগ্রাহী অনুষ্ঠানের পরিসমাপ্তি ঘটে বিকাল সাড়ে তিন ঘটিকায়।
Tuesday, August 8, 2023
শ্রদ্ধায়-স্মরণে: শ্রীময় নিরঞ্জন সরদারের দ্বিবার্ষিক স্মরণসভা
Subscribe to:
Post Comments (Atom)















No comments:
Post a Comment