Monday, July 24, 2023

১৫-তম স্বজনমিলন উৎসব উদযাপন

পৌন্ড্র মহাসংঘ আয়োজিত ১৫-তম স্বজনমিলন উৎসব উদযাপন

                   প্রতিবেদকঃ সুদর্শন মণি  

গত ২২-শে জুলাই ২০২৩, শনিবার, পৌন্ড্র মহাসংঘ আয়োজিত ১৫-তম স্বজনমিলন উৎসব সাড়ম্বরে অনুষ্ঠিত হয় বারুইপুর শহরের অন্তর্গত বেলতলার 'তেরোপার্বণ' সভাঘরে। শ্রাবণী-বর্ষার যাবতীয় ভ্রুকুটি অগ্রাহ্য করে স্থানীয় স্বজনবর্গ ও শুভানুধ্যায়ীদের হার্দিক উদ্যোগ, প্রচেষ্টা এবং পশ্চিমবঙ্গের বিভিন্ন জেলাসমূহ থেকে আগত প্রায় একশোজন স্বজনবর্গ ও অভ্যাগত অতিথিবৃন্দের উপস্থিতিতে মহাসংঘের পতাকা উত্তোলনের মধ্য দিয়ে এই মহতী অনুষ্ঠানের শুভ উদ্বোধন ঘটে সকাল সাড়ে দশটায়। স্বাজাত্যবোধ- উদ্রেককারী স্লোগান সহকারে পতাকা উত্তোলন করেন মহাসংঘের বর্তমান সভাপতি মাননীয় মেঘনাথ হালদার মহাশয়। পৌন্ড্র মনীষাসহ বহুজন মনীষীদের  প্রতিকৃতিতে পুষ্পার্ঘ্য ও মাল্যার্পণের অব্যবহিত পরেই অনুষ্ঠানের প্রথম পর্বটি অনুষ্ঠিত হতে থাকে মহাসংঘের বর্তমান পরিচালন সমিতির সহকারী সম্পাদক শ্রীমান সুব্রত সরদারের দক্ষ পরিচালনায়। তিনি অনুষ্ঠানের সম্মানীয় সভাপতি মেঘনাদ হালদার এবং বিশিষ্ট অতিথিবর্গকে মঞ্চে আসন গ্রহণের জন্য আহ্বান জানান।   

প্রবীন সঙ্গীতশিল্পী মাননীয় হারাধন রায় কর্তৃক সুশ্রাব্য উদ্বোধনী সঙ্গীত পরিবেশন এবং সভাপতি প্রদত্ত স্বাগত ভাষণের অব্যবহিত পর সংশ্লিষ্ট অনুষ্ঠানের বিশেষ কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত অধ্যাপক (ডঃ) সনৎকুমার নস্কর ও সুব্রত সরদারের যুগ্ম সম্পাদনা এবং পৌন্ড্র মহাসংঘের প্রকাশনায় "পৌন্ড্র-মনীষা, ৯ম খন্ডের" আবরণ উন্মোচনের পাশাপাশি অভূতপূর্ব সামাজিক দায়বদ্ধতা ও অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ চারজন বিশিষ্ট পৌন্ড্র- ব্যক্তিবর্গকে মানপত্র সহকারে বিশেষ সম্মাননা প্রদানের সূত্রে প্রথম পর্বটি সঞ্চালিত হতে থাকে। 'পৌন্ড্র মনীষা, ৯ম খন্ডের' আবরণ উন্মোচন করেন বিশিষ্ট অতিথি ডাঃ প্রদীপ কুমার বর্মণ মহাশয়। দুইজন পৌন্ড্র মনীষী সংকলিত লুপ্তপ্রায় কয়েকটি  গ্রন্থের (বিশেষত নরোত্তম হালদার মহাশয় সংকলিত গঙ্গারিডি ইতিহাস ও সংস্কৃতির উপকরণ, তাম্রলিপ্ত-গঙ্গারিডি-সুন্দরবন এবং পেরিপ্লাস অব দ্য ইরিথ্রিয়ান সী (অনুবাদ) মূল্যবান গ্রন্থ) পরিচয়জ্ঞাপন, তাৎপর্য ও অপরিসীম গুরুত্ব পর্যালোচনা করেন ডঃ সনৎকুমার নস্কর। সারা ভারতসহ এশিয়ার বিভিন্ন দেশে উচ্চ-প্রশংসিত ও পুরস্কৃত আধুনিক কাঠি-পুতুলনাচ শিল্পী ও পরিচালক মাননীয় নিরাপদ মন্ডল, প্রবীন গাজন-গানের লেখক, সঙ্গীত পরিচালক ও বিশিষ্ট আম্বেদকরবাদী মাননীয় হারাধন রায়, সমকালীন বহুজনমুক্তি আন্দোলনের অক্লান্ত অধিনায়িকা ও অকুতোভয় সুলেখিকা শ্রীময়ী স্বস্তি সরদার ভৌমিক এবং দক্ষিণবঙ্গের স্বতন্ত্র লোকসংস্কৃতির অন্যতম বিশিষ্ট কর্ণধার মাননীয় ক্ষুদিরাম পুরকাইতবাবুর হাতে সদ্য-প্রকাশিত 'পৌন্ড্র-মনীষা, ৯ম খন্ডের একটি করে প্রতিলিপি সমেত মানপত্র প্রদান করে সম্মাননা প্রদান করা হয়। সম্মানিত মানপত্র প্রাপকগণ সংশ্লিষ্ট বিষয়ের উপর তাঁদের মূল্যবান বক্তব্য উপস্থাপন করে উপস্থিত স্বজনদের আলোকিত করেন। মানপত্রগুলি বাঁধানোর দায়িত্ব যত্নসহকারে পালন করেন মহাসংঘের কার্যনির্বাহী সমিতির অন্যতম প্রধান সদস্য মাননীয় কালাচাঁদ নস্কর মহাশয়।

পৌন্ড্র-জনগোষ্ঠীর আর্থসামাজিক, শৈক্ষিক, রাজনৈতিক ও সাংস্কৃতিক বিষয়-সম্বলিত প্রথম পর্যায়ের অন্তর্ভুক্ত "বাবাসাহেবের বহুজনমুক্তি ও আত্মমর্যাদা প্রতিষ্ঠার আন্দোলনের নিরীখে পৌন্ড্র মহাসংঘের সচেতন ভূমিকা"র মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের উপর সবিশেষ আলোকপাত করেন মাননীয় মেঘনাথ হালদার মহাশয়। 'পৌন্ড্র জনগোষ্ঠীর বর্তমান নিদ্রামগ্ন অবস্থান এবং এহেন দুর্দশা থেকে উত্তোরণের উপায় অন্বেষণের' মতো জটিলতম একটি বিষয়ের ওপর মনোজ্ঞ বিশ্লেষণে উপস্থিত স্বজনবর্গকে চিন্তাঋদ্ধ ,উৎসাহিত ও উদ্দীপিত করেন কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক (ডঃ) সনৎকুমার নস্কর মহাশয়। 'সুন্দরবনবাসী পৌন্ড্র-আন্দোলনের সেকাল ও একাল' সম্পর্কিত জাগরণ উদ্রেককারী আলোচনার প্রারম্ভে শ্লেষাত্মক হতাশা প্রকাশ করেন সমকালীন বহুজনমুক্তি আন্দোলনের অন্যতম অগ্রদূত, সমাজসংস্কারক, বিশিষ্ট দলিত-সাহিত্যিক ও স্পষ্টবক্তা মাননীয় ডাঃ প্রদীপ কুমার বর্মন মহাশয়। তিনি বহুজনমুক্তি আন্দোলনে সংগঠিতভাবে সক্রিয় অংশগ্রহণের জন্য সমকালীন যুবসমাজের প্রতি আহ্বান জানান। উপস্থিত শ্রোতৃবর্গ তাঁর ঝাঁঝালো আলোচনায় স্বভাবতঃই অপ্রতিভ বোধ করলেও মানসিকভাবে উদ্দীপিত বোধ করেন। পরবর্তী আলোচক পৌন্ড্র শিল্পপতি দেবাশীষ মন্ডলের বক্তব্যে মূলত বেকার স্বজনদের জীবন-জীবিকার উপায় অন্বেষণের বিষয়টি আলোকিত হয়। তিনি বেকার যুবক-যুবতীদের ব্যাঙ্কঋণ মারফৎ বিভিন্ন ধরনের ক্ষুদ্র ও মাঝারি ব্যবসায় মনোনিবেশের পরামর্শ দেন এবং এব্যাপারে কেউ উদ্যোগি হলে সাহায্যের ঋণ সংগ্রহের বিষয়ে সাহায্যের প্রতিশ্রুতি দেন।    

মধ্যাহ্নভোজের বিরতির পর দ্বিতীয় পর্যায়ের আলোচনা শুরু হয় ভারতীয় জীবনবীমা নিগমের প্রথম শ্রেণীভুক্ত আধিকারিক, সংবেদনশীল, সমাজদরদী ও সমাজকল্যাণে নিষ্ঠাবতী শ্রীময়ী শকুন্তলা পুরকাইতের সহজ-সরল ও সাবলীল বক্তব্য উপস্থাপনার মধ্য দিয়ে। মিষ্টভাষিণী শকুন্তলা তাঁর বক্তব্যে প্রধানত পৌন্ড্র মহিলাদের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক দায়বদ্ধতার উপর আলোকপাত করেন। তৎকালীন বিশিষ্ট দুইজন পৌন্ড্র সমাজসেবী ও বীরাঙ্গনা নারী-মন্দিরবাজার অঞ্চলের বাসিন্দা 'হাউড়িদেবী' এবং 'তেভাগা আন্দোলনে' অংশগ্রহণকারী বীরাঙ্গনা, সুন্দরবন এলাকায় ভূমিপুত্রী 'সৌরভী মন্ডলের ' অপরিসীম অবদান ও আত্মত্যাগের নিদর্শন তুলে ধরেন। সাথে সাথে পৌন্ড্র মহিলাদের বিজ্ঞানমনস্ক হতে আবেদন রাখেন। বিশিষ্ট আম্বেদকরবাদী ভগিনীদ্বয় স্বস্তি ও রূপা সরদার, প্রবীণ সমাজসেবক মাননীয় নির্মল সরদার, পৌন্ড্র মহাসংঘের পরিচালন সমিতির সদস্যা মাননীয়া মিনতি সরদার প্রমুখ তাঁদের নাতিদীর্ঘ বক্তব্যে সামাজিক, সাংস্কৃতিক, শিশুদের মানসিক বিকাশ ও রাজনৈতিক ক্ষেত্রে বহুজন আন্দোলনে অংশগ্রহণের জন্য স্বজনদের আহ্বান জানান। ইত্যবসরে পৌন্ড্র জনগোষ্ঠীর অতীত সংস্কৃতি বিষয়ক সঙ্গীত, কবিতা ও বিশ্বরত্ন ডঃ আম্বেদকরের প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য-সংগীত উপস্থাপনায় শ্রোতৃবর্গকে রোমাঞ্চিত করে তাঁদের মানসিক আনন্দ ও উৎসাহ বর্ধন করেন যথাক্রমে সঙ্গীতশিল্পী জয়দেব মন্ডল, গোষ্টবিহারী নস্কর ও ভক্তরাম সরদার। বিশেষভাবে উল্লেখনীয় শিক্ষক জয়দেব মন্ডল রচিত, সুরারোপিত পৌণ্ড্রদের গৌরবোজ্জ্বল অতীত ইতিহাসের উপর তাঁরই গাওয়া গানটি যা একটি দলিল হিসাবে বিবেচিত হতে পার। সমকালীন বহুজনমুক্তি ও আম্বেদকরবাদী  আন্দোলনের প্রথম সারির নেতৃত্বদানকারী, দার্শনিক, সমাজহিতৈষী, বিচারশীল এবং আকর্ষণীয়-সুবক্তা, আচার্য্য জগদীশচন্দ্র বোস বিকলেজের অধ্যাপক সুধাকর সরদারের বহুপ্রতিক্ষিত বক্তব্যটি উপস্থাপিত হয়। তাঁর গুরুত্বপূর্ণ আলোচ্য বিষয়টি ছিল 'ভারতের দলিত আন্দোলনের বর্তমান প্রেক্ষাপট'। তিনি বিখ্যাত চিন্তাবিদদের ও বাবাসাহেবের গবেষণাধর্মী গ্রন্থের বিভিন্ন উদ্ধৃতির সহায়তায় শ্রোতৃবর্গকে বোঝাতে সক্ষম হয়েছেন যে, প্রাচীন পৃথিবীর বিভিন্ন  দেশে রাজনৈতিক বিপ্লবের পূর্বে সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও ধর্মীয় বিপ্লব সংঘটিত হয়েছিল। দলিত রাজনৈতিক চিন্তাবিদদের সেখানেই বিশেষ ভূমিকা পালনের অপ্রতুলতা দেখা যাচ্ছে। তাঁর মতে, পৌন্ড্র তথা সমগ্র বহুজন সমাজকে সাংস্কৃতিক বিপ্লবের পথে অগ্রসর হয়ে সংগঠিত-সক্রিয়তা গ্রহণের জন্য দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। তিনি বলেন যে, দলিত আন্দোলনের সফলতার জন্য প্রতিপক্ষ হিসাবে লক্ষ্যের কেন্দ্রে আনতে হবে ব্রাহ্মণ্যবাদিদেরকে যারা সংরক্ষণ থেকে শিক্ষা,সম্মানীয় সামাজিক অবস্থান, সম্পত্তি সবই গ্রাস করে নিচ্ছে। কিন্তু, স্বার্থান্বেষীরা সেই প্রতিপক্ষের জায়গায় দেশের সংখ্যালঘু সম্প্রদায়কে  উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে দেখানোর চেষ্টা করে যাচ্ছে যাতে দলিত আন্দোলন লক্ষ্যভ্রষ্ট হচ্ছে। তাঁর হৃদয়গ্রাহী ও অন্তর্দৃষ্টিপ্রসূত এইরূপ স্বাবলীল বক্তব্যে সম্মানীয় শ্রোতৃবর্গ অতিশয় সমৃদ্ধ, উদ্দীপিত ও উৎসাহিত হয়ে ওঠেন।

চা পানের বিরতির পর পুনরায় আলোচনা সভার শুরু হয় তথ্যচিত্র নির্মাতা সইফুর রহমানের বক্তব্যে। তিনি সংগঠিত রাজনৈতিক আন্দোলনের সহায়তায় ব্যবস্থা পরিবর্তনের মধ্য দিয়ে রাজনৈতিক ক্ষমতা দখলের উপর প্রাধান্য দিয়েছেন। অল ইন্ডিয়া জিএসটি সেন্ট্রাল সার্ভিস এ্যান্ড ওয়েস্ট বেঙ্গল কাস্টমস বিভাগের এসসি,এসটি ও ওবিসি ইউনিয়নের সভাপতি মাননীয় গৌর নস্করের বক্তব্যের পর সমাজসংস্কার আন্দোলনের অন্যতম পুরোধা-ব্যক্তিত্ব, শিক্ষক মৃত্যুঞ্জয় সরদার তাঁর বক্তব্যের ভাবার্থের মধ্য দিয়ে পৌন্ড্র জনগোষ্ঠীর ধর্মাচরণের বিষয়ে অযৌক্তিক ভাবনা থেকে বেরিয়ে যৌক্তিকভাবে ইতিবাদী হতে আহ্বান জানান। তরুণ প্রজন্মের অধ্যাপক কার্তিক মন্ডল পৌন্ড্র জনগোষ্ঠী তথা সমগ্র দলিত মানুষের শিক্ষা ও সচেতনতার হার বৃদ্ধির জন্য মাসিক বা পাক্ষিক পৌন্ড্র সমাচার প্রকাশের প্রস্তাব দেন। পৌন্ড্র মহাসংঘের কার্যকরী সমিতির সদস্য মাননীয় বৃন্দাবন নস্করের সংক্ষিপ্ত বক্তব্যে পুরোহিতবর্জিত শ্রদ্ধানুষ্ঠানের বিষয়টি আলোকিত হয়। শেষ পর্যায়ে মাননীয় সুজিত পুরকাইত, পৌন্ড্র মহাসংঘের বর্তমান সম্পাদক মাননীয় দুলালচন্দ্র সরদার প্রমুখ সংক্ষিপ্ত বক্তব্য রাখেন। বক্তব্যের সঙ্গে সম্পর্কিত প্রাসঙ্গিক টিপ্পণীর উপস্থাপনায় বক্তব্যের গুরুত্ব বর্ধন অব্যহত রাখেন অনুষ্ঠানের সঞ্চালক সুব্রত সরদার।স্বজনমিলন অনুষ্ঠানের সর্বশেষ আকর্ষণ ছিল শ্রতিমধুর সঙ্গীত পরিবেশন। সুকণ্ঠী শিক্ষিকা মাননীয়া সীমা নস্কর পরিবেশিত সঙ্গীতের সুর-মূর্ছনায় সমস্ত সভাঘরটি উদ্বেলিত ও উজ্জীবিত হয়ে ওঠে। বিশেষ এই অনুষ্ঠানটি সুচারুভাবে পরিচালনা ও সম্পন্ন করেন তরুণ উপস্থাপক শ্রীমান সুব্রত সরদার। পরিশেষে সর্বস্তরের স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের ঐকান্তিক সহযোগিতা ও প্রচেষ্টায় পৌন্ড্র মহাসংঘ আয়োজিত ১৫-তম স্বজনমিলন অনুষ্ঠানটি সফলভাবে সম্পন্ন হওয়াতে, অনুষ্ঠানের সভাপতি স্বজন ও শুভানুধ্যায়ীদের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন; এবং ধন্যবাদজ্ঞাপক ভাষণের পর অনুষ্ঠানটির পরিসমাপ্তি ঘোষিত হয়।

 **প্রতিবেদন প্রস্তুতির প্রয়োজনে পর্যায়ক্রমিক তথ্যের যোগান দিয়ে সহায়তা করেন অধ্যাপক সুধাকর সরদার।** 

দুঃখিত, কিছু ভিডিও আপলোড করা গেল না, সাইজ বড় হওয়ার জন্য। 

 




































 

Monday, July 3, 2023

প্রয়াতা পান্তবালা নস্করের স্মরণসভা ও শ্রদ্ধানুষ্ঠান

 বারুইপুর থানার আওতাধীন নবগ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত তেউরহাট গ্রামের অধিবাসী মহাপরিনিব্বাণপ্রাপ্তা (প্রয়ান দিবস ১৬/০৬/২০২৩) শ্রীময়ী পান্তবালা নস্করের স্মরণে ও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন উপলক্ষে গত ২-রা জুলাই রবিবার,সকাল ১০-টায় তেউরহাট গ্রামস্থ বাসভবনে স্মরণসভা ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই মহতী অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেন শ্রীময়ী পান্তবালা নস্করে জ্যেষ্ঠপুত্র গোপাল নস্কর, মধ্যমপুত্র ভূপাল নস্কর ও কনিষ্ঠপুত্র পালান নস্কর। মূলত শ্রীময়ী পান্তবালা নস্করের মধ্যম পুত্র ভূপাল চন্দ্র নস্করের উদ্যোগে অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হয়। সঙ্গে সহযোগিতা করেন পুত্রবধূ ভগবতী নস্কর, রীনা নস্কর, শকুন্তলা নস্কর ও পাঞ্চালি নস্কর। আরও প্রকাশ যে, এই মহতী কর্ম সম্পাদনে অকুণ্ঠ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন শ্রীময়ী পান্তবালা নস্করের কন্যা সুমিতা ও কবিতা  মন্ডল; জামাতা রঞ্জিত মন্ডল ও সুনীল মন্ডল; নাতি অসীম, রোহিত, শুভেন্দু, সুব্রত, দীননাথ, পার্থ, নন্দকুমার, বিধান ও সুকান্ত এবং নাতনি করুণা রুম্পা, রিম্পা, শম্পা, চম্পা, পম্পা, পদ্মা, পল্লবী, কালি ও সুশীলা।  

সুগন্ধি পুষ্পশোভিত মঞ্চ-প্রস্তুতির দায়িত্ব সযত্নে পালন করেন বিশিষ্ট শিক্ষক মৃত্যুঞ্জয় সরদার ও শিক্ষিকা রূপা সরদার। নস্কর পরিবারের পূর্বজগণের নামের তালিকা শোভিত মঞ্চটির মধ্যস্থলে বিরাজমানা শ্রীময়ী পান্তবালা নস্করের প্রতিকৃতি সহ দুদিকে বিরাজমান বিশ্বমানব তথাগত বুদ্ধ ও বিশ্ববরেণ্য পন্ডিত বাবাসাহেব ডঃ ভীমরাও আম্বেদকরের প্রতিকৃতিতে মাল্যার্পণের পর মূল অনুষ্ঠানটি উপস্থাপিত হয়। পূর্বজদের প্রদর্শিত পন্থার অনুসরণে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক সনাতন মাঙ্গলিক পদ্ধতিতে উক্ত অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক,কবি, সমাজচিন্তক ও সুবক্তা শ্রীময় প্রদীপ কুমার বর্মন মহাশয়। শ্রদ্ধানুষ্ঠানের শুরুতেই ছিল সনাতনী পদ্ধতিতে পান-সুপারি দিয়ে আত্মীয়, অতিথি, প্রতিবেশি ও রাঁধুনীকে বরণ করে নেওয়ার প্রথা এবং তাঁদের কাছ থেকে অনুষ্ঠানটি সংঘটিত করার  অনুমতি প্রাপ্তি।  প্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও শঙ্খধ্বনি সহযোগে একে একে শ্রীময়ী পান্তবালা নস্করের স্মরণে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদনের পর পঞ্চভূতের (পাঁচটি উপাদান—মাটি, জল, আগুন, বায়ু ও বৃক্ষ) আবাহন ও বন্দনার ঔৎকর্ষে অনুষ্ঠানটি মূহুর্তের মধ্যেই একটি ভাবগম্ভীর পরিবেশে রূপান্তরিত হয়। প্রয়াতার প্রতি এক মিনিটের নীরবতা পালন এই পরিবেশকে অন্য মাত্রা দেয়। পুত্র,কন্যা, জামাতা নাতি- নাতনিগণ স্মৃতিমেদূরতায় আবেগতাড়িত হয়ে ওঠেন। মায়ের স্মৃতিচারণে আবেগতাড়িত সন্তানবৃন্দ বাকরুদ্ধ হয়ে যান এবং তাঁদের চক্ষুদ্বয় অশ্রু সজল হয়ে ওঠে। উপস্থিত সমস্ত পরিবার-পরিজনবর্গ, আত্মীয়স্বজন ও অতিথিবর্গ সঞ্চালকের আবেগঘন উপস্থাপনা এবং অনুষ্ঠানটির প্রাসঙ্গিকতা সাপেক্ষে বিশিষ্ট শিক্ষক ও গায়ক জয়দেব মন্ডল পরিবেশিত শ্রদ্ধাসঙ্গীতের মূর্ছনায় আবেগবিহ্বল ও শ্রদ্ধাবনত হয়ে যান।

মহাপরিনিব্বাণপ্রাপ্তা শ্রীময়ী পান্তবালা নস্করের স্মৃতিচারণ ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন অনুষ্ঠানটির প্রথম পর্বটি পরিসমাপ্তির অব্যবহিত পরেই 'প্রচলিত প্রথায় শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের' বিকল্পে 'স্মৃতিচারণ ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন' অনুষ্ঠানের তাৎপর্য ও প্রয়োজনীয়তার সপক্ষে অত্যন্ত যুক্তিনির্ভর এবং বিজ্ঞানসম্মত একটি মনোজ্ঞ আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় পর্বে। উক্ত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পৌণ্ড্র মহাসংঘের একনিষ্ঠ কর্মী ও সমাজসেবী মাননীয় বৃন্দাবন নস্কর মহাশয়। প্রধান অতিথির পদ অলংকৃত করেন শিক্ষাবিদ, সমাজদরদী এবং সুদক্ষ বাগ্মী,অধ্যাপক মাননীয় সুধাকর সরদার মহাশয়। এই পর্বের অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন শিক্ষক মৃত্যুঞ্জয় সরদার। অনুষ্ঠানটি শুরু হয় প্রধান  পরিচালক মাননীয় প্রদীপ কুমার বর্মনের বক্তব্য দিয়ে। তিনি তাঁর সচেতন শব্দচয়ন ও স্বভাবসিদ্ধ উপস্থানায় প্রয়াত ব্যক্তির শ্রাদ্ধের পরিবর্তে তাঁর স্মৃতিচারণ ও শ্রদ্ধা নিবেদনের গুরুত্ব প্রকাশ করেন স্বাবলীল ভাষা প্রক্ষেপণে। প্রদীপবাবুর দীর্ঘ বক্তব্যের সারাংশ হলো শ্রাদ্ধ মূলত অপচয়ভিত্তিক একটি পরিকল্পিত প্রথা। মানুষের যেমন জন্ম আছে, তেমনি একটি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে মৃত্যুর পর তাঁর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং তিনি পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যান। প্রয়ানের পর তাঁর চতুস্পর্শী গুণের মূল্যায়নের মাধ্যমে স্মৃতিচারণ ও শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনই শ্রেয়। প্রদীপবাবুর বক্তব্যের সূত্রে বহু প্রতিক্ষিত চেতনা সঞ্চারক বক্তব্যটি উপস্থাপন করেন অধ্যাপক সুধাকর সরদার মহাশয়। তাঁর আলোচনার ব্যাপ্তি বহুচর্চিত। তিনি সাবলীল ভাষায় বিভিন্ন শাস্ত্রীয় ভাষ্যের সহায়তায় সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় আচারের নীরিখে শ্রাদ্ধের পরিবর্তে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের যৌক্তিকতা সাপেক্ষে, তত্ত্ব ও তথ্যনির্ভর বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তাঁর মনোজ্ঞ আলোচনায় উপস্থিত সমস্ত শ্রোতৃবৃন্দ আলোড়িত, উত্তেজিত ও প্রভাবিত হতে বাধ্য হন। তাদের অনেকেরই চালচলনে যেন নতুন আলোর পথ আবিস্কারের ঈঙ্গিত ফুটে উঠেছে। অনেকেই হয়তো এমন একটি যুক্তিভিত্তিকভাবে অনস্বীকার্য উপস্থাপনায় প্রভাবিত হয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন অনুষ্ঠান আয়োজনের সদর্থক অথচ নীরব অঙ্গীকার জানিয়ে পরিতৃপ্ত হয়েছেন। বক্তব্যের মধ্যেকার সময়ে সঞ্চালকের সংযোজন ছিল যথেষ্ট যুক্তিনির্ভর ও তত্ব, তথ্যে সমৃদ্ধ। শ্রোতাদের মধ্যে অনেকেই আন্তরিকতাসহ চাইছিলেন এমন চৈতন্যদায়ী বক্তব্যের ধারা অব্যাহত থাক। কিন্তু, সময়াভাবে সঞ্চালক আলোচনাসভার পরিসমাপ্তি ঘোষণায় বাধ্য হন।    

মহাপরিনিব্বাণপ্রাপ্তা শ্রীময়ী পান্তবালা নস্করের স্মরণে ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যে সমস্ত বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দ,তাঁরা হলেন যথাক্রমে সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ডাক্তার কালাচাঁদ নস্কর, শিক্ষিকা রূপা সরদার, শিক্ষিকা সীমা নস্কর, শ্যামল কুমার সরদার, রবীন্দ্রনাথ সরকার, জ্যোতির্ময় মন্ডল, নিমাই সরদার, তপন সরদার, তপন মণ্ডল, রূপালী মন্ডল, চন্দনা নস্কর, বর্ণালী নস্কর সহ অসংখ্য সম্মানীয় অতিথিবৃন্দ। অবশেষে মহাপরিনিব্বাণপ্রাপ্তা শ্রীময়ী পান্তবালা নস্করের  স্মরণ ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য আয়োজিত উক্ত ভাবগম্ভীর ও মহতী অনুষ্ঠানটির পরিসমাপ্তি ঘোষিত হয় বিকাল ২.৩০-মিনিটে।

প্রতিবেদকঃ সুদর্শন মণি