Monday, July 3, 2023

প্রয়াতা পান্তবালা নস্করের স্মরণসভা ও শ্রদ্ধানুষ্ঠান

 বারুইপুর থানার আওতাধীন নবগ্রাম পঞ্চায়েতের অন্তর্গত তেউরহাট গ্রামের অধিবাসী মহাপরিনিব্বাণপ্রাপ্তা (প্রয়ান দিবস ১৬/০৬/২০২৩) শ্রীময়ী পান্তবালা নস্করের স্মরণে ও তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাজ্ঞাপন উপলক্ষে গত ২-রা জুলাই রবিবার,সকাল ১০-টায় তেউরহাট গ্রামস্থ বাসভবনে স্মরণসভা ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন সভা অনুষ্ঠিত হয়। এই মহতী অনুষ্ঠানটি আয়োজন করেন শ্রীময়ী পান্তবালা নস্করে জ্যেষ্ঠপুত্র গোপাল নস্কর, মধ্যমপুত্র ভূপাল নস্কর ও কনিষ্ঠপুত্র পালান নস্কর। মূলত শ্রীময়ী পান্তবালা নস্করের মধ্যম পুত্র ভূপাল চন্দ্র নস্করের উদ্যোগে অনুষ্ঠানটি আয়োজিত হয়। সঙ্গে সহযোগিতা করেন পুত্রবধূ ভগবতী নস্কর, রীনা নস্কর, শকুন্তলা নস্কর ও পাঞ্চালি নস্কর। আরও প্রকাশ যে, এই মহতী কর্ম সম্পাদনে অকুণ্ঠ সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেন শ্রীময়ী পান্তবালা নস্করের কন্যা সুমিতা ও কবিতা  মন্ডল; জামাতা রঞ্জিত মন্ডল ও সুনীল মন্ডল; নাতি অসীম, রোহিত, শুভেন্দু, সুব্রত, দীননাথ, পার্থ, নন্দকুমার, বিধান ও সুকান্ত এবং নাতনি করুণা রুম্পা, রিম্পা, শম্পা, চম্পা, পম্পা, পদ্মা, পল্লবী, কালি ও সুশীলা।  

সুগন্ধি পুষ্পশোভিত মঞ্চ-প্রস্তুতির দায়িত্ব সযত্নে পালন করেন বিশিষ্ট শিক্ষক মৃত্যুঞ্জয় সরদার ও শিক্ষিকা রূপা সরদার। নস্কর পরিবারের পূর্বজগণের নামের তালিকা শোভিত মঞ্চটির মধ্যস্থলে বিরাজমানা শ্রীময়ী পান্তবালা নস্করের প্রতিকৃতি সহ দুদিকে বিরাজমান বিশ্বমানব তথাগত বুদ্ধ ও বিশ্ববরেণ্য পন্ডিত বাবাসাহেব ডঃ ভীমরাও আম্বেদকরের প্রতিকৃতিতে মাল্যার্পণের পর মূল অনুষ্ঠানটি উপস্থাপিত হয়। পূর্বজদের প্রদর্শিত পন্থার অনুসরণে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক সনাতন মাঙ্গলিক পদ্ধতিতে উক্ত অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন বিশিষ্ট সাহিত্যিক,কবি, সমাজচিন্তক ও সুবক্তা শ্রীময় প্রদীপ কুমার বর্মন মহাশয়। শ্রদ্ধানুষ্ঠানের শুরুতেই ছিল সনাতনী পদ্ধতিতে পান-সুপারি দিয়ে আত্মীয়, অতিথি, প্রতিবেশি ও রাঁধুনীকে বরণ করে নেওয়ার প্রথা এবং তাঁদের কাছ থেকে অনুষ্ঠানটি সংঘটিত করার  অনুমতি প্রাপ্তি।  প্রদীপ প্রজ্জ্বলন ও শঙ্খধ্বনি সহযোগে একে একে শ্রীময়ী পান্তবালা নস্করের স্মরণে পুষ্পার্ঘ্য নিবেদনের পর পঞ্চভূতের (পাঁচটি উপাদান—মাটি, জল, আগুন, বায়ু ও বৃক্ষ) আবাহন ও বন্দনার ঔৎকর্ষে অনুষ্ঠানটি মূহুর্তের মধ্যেই একটি ভাবগম্ভীর পরিবেশে রূপান্তরিত হয়। প্রয়াতার প্রতি এক মিনিটের নীরবতা পালন এই পরিবেশকে অন্য মাত্রা দেয়। পুত্র,কন্যা, জামাতা নাতি- নাতনিগণ স্মৃতিমেদূরতায় আবেগতাড়িত হয়ে ওঠেন। মায়ের স্মৃতিচারণে আবেগতাড়িত সন্তানবৃন্দ বাকরুদ্ধ হয়ে যান এবং তাঁদের চক্ষুদ্বয় অশ্রু সজল হয়ে ওঠে। উপস্থিত সমস্ত পরিবার-পরিজনবর্গ, আত্মীয়স্বজন ও অতিথিবর্গ সঞ্চালকের আবেগঘন উপস্থাপনা এবং অনুষ্ঠানটির প্রাসঙ্গিকতা সাপেক্ষে বিশিষ্ট শিক্ষক ও গায়ক জয়দেব মন্ডল পরিবেশিত শ্রদ্ধাসঙ্গীতের মূর্ছনায় আবেগবিহ্বল ও শ্রদ্ধাবনত হয়ে যান।

মহাপরিনিব্বাণপ্রাপ্তা শ্রীময়ী পান্তবালা নস্করের স্মৃতিচারণ ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন অনুষ্ঠানটির প্রথম পর্বটি পরিসমাপ্তির অব্যবহিত পরেই 'প্রচলিত প্রথায় শ্রাদ্ধানুষ্ঠানের' বিকল্পে 'স্মৃতিচারণ ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন' অনুষ্ঠানের তাৎপর্য ও প্রয়োজনীয়তার সপক্ষে অত্যন্ত যুক্তিনির্ভর এবং বিজ্ঞানসম্মত একটি মনোজ্ঞ আলোচনাসভা অনুষ্ঠিত হয় দ্বিতীয় পর্বে। উক্ত অনুষ্ঠানে সভাপতিত্ব করেন পৌণ্ড্র মহাসংঘের একনিষ্ঠ কর্মী ও সমাজসেবী মাননীয় বৃন্দাবন নস্কর মহাশয়। প্রধান অতিথির পদ অলংকৃত করেন শিক্ষাবিদ, সমাজদরদী এবং সুদক্ষ বাগ্মী,অধ্যাপক মাননীয় সুধাকর সরদার মহাশয়। এই পর্বের অনুষ্ঠানটি পরিচালনা করেন শিক্ষক মৃত্যুঞ্জয় সরদার। অনুষ্ঠানটি শুরু হয় প্রধান  পরিচালক মাননীয় প্রদীপ কুমার বর্মনের বক্তব্য দিয়ে। তিনি তাঁর সচেতন শব্দচয়ন ও স্বভাবসিদ্ধ উপস্থানায় প্রয়াত ব্যক্তির শ্রাদ্ধের পরিবর্তে তাঁর স্মৃতিচারণ ও শ্রদ্ধা নিবেদনের গুরুত্ব প্রকাশ করেন স্বাবলীল ভাষা প্রক্ষেপণে। প্রদীপবাবুর দীর্ঘ বক্তব্যের সারাংশ হলো শ্রাদ্ধ মূলত অপচয়ভিত্তিক একটি পরিকল্পিত প্রথা। মানুষের যেমন জন্ম আছে, তেমনি একটি নির্দিষ্ট সময়ের ব্যবধানে মৃত্যুর পর তাঁর জীবনের পরিসমাপ্তি ঘটে এবং তিনি পঞ্চভূতে বিলীন হয়ে যান। প্রয়ানের পর তাঁর চতুস্পর্শী গুণের মূল্যায়নের মাধ্যমে স্মৃতিচারণ ও শ্রদ্ধার্ঘ্য নিবেদনই শ্রেয়। প্রদীপবাবুর বক্তব্যের সূত্রে বহু প্রতিক্ষিত চেতনা সঞ্চারক বক্তব্যটি উপস্থাপন করেন অধ্যাপক সুধাকর সরদার মহাশয়। তাঁর আলোচনার ব্যাপ্তি বহুচর্চিত। তিনি সাবলীল ভাষায় বিভিন্ন শাস্ত্রীয় ভাষ্যের সহায়তায় সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মীয় আচারের নীরিখে শ্রাদ্ধের পরিবর্তে শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের যৌক্তিকতা সাপেক্ষে, তত্ত্ব ও তথ্যনির্ভর বক্তব্য উপস্থাপন করেন। তাঁর মনোজ্ঞ আলোচনায় উপস্থিত সমস্ত শ্রোতৃবৃন্দ আলোড়িত, উত্তেজিত ও প্রভাবিত হতে বাধ্য হন। তাদের অনেকেরই চালচলনে যেন নতুন আলোর পথ আবিস্কারের ঈঙ্গিত ফুটে উঠেছে। অনেকেই হয়তো এমন একটি যুক্তিভিত্তিকভাবে অনস্বীকার্য উপস্থাপনায় প্রভাবিত হয়ে শ্রদ্ধাজ্ঞাপন অনুষ্ঠান আয়োজনের সদর্থক অথচ নীরব অঙ্গীকার জানিয়ে পরিতৃপ্ত হয়েছেন। বক্তব্যের মধ্যেকার সময়ে সঞ্চালকের সংযোজন ছিল যথেষ্ট যুক্তিনির্ভর ও তত্ব, তথ্যে সমৃদ্ধ। শ্রোতাদের মধ্যে অনেকেই আন্তরিকতাসহ চাইছিলেন এমন চৈতন্যদায়ী বক্তব্যের ধারা অব্যাহত থাক। কিন্তু, সময়াভাবে সঞ্চালক আলোচনাসভার পরিসমাপ্তি ঘোষণায় বাধ্য হন।    

মহাপরিনিব্বাণপ্রাপ্তা শ্রীময়ী পান্তবালা নস্করের স্মরণে ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপন অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন যে সমস্ত বিশিষ্ট অতিথিবৃন্দ,তাঁরা হলেন যথাক্রমে সামাজিক আন্দোলনের সঙ্গে যুক্ত ডাক্তার কালাচাঁদ নস্কর, শিক্ষিকা রূপা সরদার, শিক্ষিকা সীমা নস্কর, শ্যামল কুমার সরদার, রবীন্দ্রনাথ সরকার, জ্যোতির্ময় মন্ডল, নিমাই সরদার, তপন সরদার, তপন মণ্ডল, রূপালী মন্ডল, চন্দনা নস্কর, বর্ণালী নস্কর সহ অসংখ্য সম্মানীয় অতিথিবৃন্দ। অবশেষে মহাপরিনিব্বাণপ্রাপ্তা শ্রীময়ী পান্তবালা নস্করের  স্মরণ ও শ্রদ্ধাজ্ঞাপনের জন্য আয়োজিত উক্ত ভাবগম্ভীর ও মহতী অনুষ্ঠানটির পরিসমাপ্তি ঘোষিত হয় বিকাল ২.৩০-মিনিটে।

প্রতিবেদকঃ সুদর্শন মণি













No comments:

Post a Comment